ট্রাম্প প্রশাসনে ক্রমবর্ধমান কোন্দলের জেরে তুলসীর পদত্যাগ

মুনা নিউজ ডেস্ক | ২৩ মে ২০২৬ ২১:১৭

ফাইল ছবি ফাইল ছবি
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প-এর প্রশাসন থেকে একের পর এক শীর্ষ কর্মকর্তার বিদায়ের তালিকায় এবার যোগ হলো ডিরেক্টর অব ন্যাশনাল ইন্টেলিজেন্স (ডিএনআই) তুলসী গ্যাবার্ড-এর নাম। গত তিন মাসে হোমল্যান্ড সিকিউরিটি সেক্রেটারি, অ্যাটর্নি জেনারেল ও শ্রমমন্ত্রীর পদত্যাগের পর ২২ মে নিজের পদ ছাড়ার ঘোষণা দেন তিনি।
 
গ্যাবার্ড জানিয়েছেন, স্বামীর ক্যানসারে আক্রান্ত হওয়ার কারণেই তিনি দায়িত্ব ছাড়ছেন। তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্প প্রশাসনের ভেতরে ধীরে ধীরে প্রভাব হারানো এবং গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত থেকে দূরে সরিয়ে রাখাই ছিল তার বিদায়ের মূল কারণ।
 
গ্যাবার্ডের এই পদত্যাগ এমন সময়ে এলো, যখন ট্রাম্প প্রশাসন আবারও ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক পদক্ষেপের সম্ভাবনা বিবেচনা করছে। জানা গেছে, এ ধরনের পরিকল্পনার বিরোধিতা করেছিলেন তুলসী গ্যাবার্ড।
 
সাবেক ডেমোক্র্যাট কংগ্রেস সদস্য ও যুদ্ধফেরত সেনা কর্মকর্তা গ্যাবার্ড বরাবরই যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতিতে ব্যতিক্রমী অবস্থানের জন্য পরিচিত ছিলেন। ২০১৭ সালে সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট বাশার-আল-আসাদ–এর সঙ্গে সাক্ষাৎ কিংবা ইউক্রেন যুদ্ধে ন্যাটোর ভূমিকা নিয়ে তার বক্তব্য ওয়াশিংটনে আলোচনার জন্ম দিয়েছিল। পরে ডেমোক্র্যাট দল ছেড়ে রিপাবলিকান পার্টিতে যোগ দিয়ে তিনি ট্রাম্পের ‘মাগা’ বলয়ের যুদ্ধবিরোধী অংশের পরিচিত মুখ হয়ে ওঠেন।
 
প্রশাসনের ভেতরে গ্যাবার্ডের বাস্তব প্রভাব খুব বেশি ছিল না বলেই মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। একাধিক কর্মকর্তার দাবি, তিনি শুরু থেকেই ট্রাম্পের মূল উপদেষ্টা বলয়ের বাইরে ছিলেন। জাতীয় নিরাপত্তা ও সামরিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে তাকে খুব একটা গুরুত্ব দেওয়া হতো না।
 
গত জানুয়ারিতে ভেনেজুয়েলায় যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অভিযানের সময় তুলসী গ্যাবার্ড প্রকাশ্যে এর বিরোধিতা করেছিলেন। সেই সময় তিনি ছুটিতে ছিলেন, যা অনেকের মতে প্রশাসনে তার সীমিত ভূমিকারই ইঙ্গিত দেয়। তবে ট্রাম্পের প্রতি তার আনুগত্য নিয়ে প্রশ্ন ছিল না। ২০২৫ সালের গোয়েন্দা ব্রিফিংয়ে তিনি কংগ্রেসকে বলেছিলেন, ইরান পারমাণবিক বোমা তৈরির চেষ্টা করছে না। কিন্তু পরে ট্রাম্প যখন ভিন্ন দাবি করেন, তখন সিনেট শুনানিতে তুলসী গ্যাবার্ড নিজের আগের বক্তব্যের সেই অংশ প্রকাশ্যে পড়তে অস্বীকৃতি জানান।
 
এছাড়া ভেনেজুয়েলা সরকারের সঙ্গে মাদক চক্রের সম্পর্ক নিয়ে ট্রাম্প প্রশাসনের দাবির বিরোধিতা করে প্রতিবেদন তৈরির কারণে দুই শীর্ষ গোয়েন্দা কর্মকর্তাকে বরখাস্তও করেছিলেন তিনি।
 
তুলসী গ্যাবার্ডের মেয়াদকালে ‘অফিস অব দ্য ডিরেক্টর অব ন্যাশনাল ইন্টেলিজেন্স’ (ওডিএনআই)-এর আকার ছোট হওয়ার পাশাপাশি সংস্থাটি অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেও জড়িয়ে পড়ে বলে অভিযোগ ওঠে। গত জানুয়ারিতে জর্জিয়ার ফুলটন কাউন্টিতে ২০২০ সালের নির্বাচন নিয়ে তদন্তের সময় এফবিআই ব্যালট জব্দ করলে তুলসী গ্যাবার্ড সেখানে উপস্থিত ছিলেন এবং ট্রাম্পের সঙ্গে ফোনে কথা বলেন। দুই মাস পর তিনি স্বীকার করেন, পুয়ের্তো রিকোর নির্বাচনে ভেনেজুয়েলার হস্তক্ষেপের অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে ওডিএনআই ভোটিং মেশিন জব্দ করেছিল। যদিও এ অভিযোগের পক্ষে কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
 
এছাড়া বাইডেন প্রশাসনের বিরুদ্ধে অভিযোগ তদন্তে ট্রাম্পের নির্দেশে একটি বিশেষ ‘ওয়ার্কিং গ্রুপ’ও গঠন করেছিলেন তিনি। তুলসী গ্যাবার্ডের বিদায়ে স্বস্তি প্রকাশ করেছেন অনেক পেশাদার গোয়েন্দা কর্মকর্তা। জর্জ মেসন ইউনিভার্সিটির হেইডেন সেন্টার ফর ইন্টেলিজেন্সের নির্বাহী পরিচালক ল্যারি পেইফার বলেন, 'তিনি কখনোই এই পদের জন্য পুরোপুরি উপযুক্ত ছিলেন না এবং দায়িত্বও ঠিকভাবে বুঝতে পারেননি।'
 
বিশ্লেষকদের মতে, গ্যাবার্ডের পদত্যাগ ট্রাম্প প্রশাসনে যুদ্ধবিরোধী অংশের প্রভাব কমে যাওয়ার ইঙ্গিত দিচ্ছে। গত মার্চে ইরানের সঙ্গে যুদ্ধের প্রতিবাদ জানিয়ে ন্যাশনাল কাউন্টারটেররিজম সেন্টারের পরিচালক জো কেন্টও পদত্যাগ করেছিলেন।
 
অন্যদিকে পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও এবং রাশিয়া-বিরোধী হিসেবে পরিচিত সিআইএ পরিচালক জন র‍্যাটক্লিফের-এর মতো কট্টর অবস্থানের কর্মকর্তাদের প্রভাব বাড়ছে বলে মনে করা হচ্ছে।
 
তবে ট্রাম্প দাবি করেছেন, তুলসী গ্যাবার্ডকে পদত্যাগে বাধ্য করা হয়নি। নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে তিনি লিখেছেন, 'তুলসী দুর্দান্ত কাজ করেছেন, আমরা তাকে মিস করব।'


আপনার মূল্যবান মতামত দিন: