ফাইল ছবি
ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ সামরিক অভিযানের ভবিষ্যৎ ও লক্ষ্য নিয়ে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও তার প্রশাসনের বক্তব্যে দেখা যাচ্ছে পরস্পরবিরোধী সংকেত। অভিযানের দশম দিনে এসে যুদ্ধের সময়সীমা ও উদ্দেশ্য নিয়ে স্পষ্ট ব্যাখ্যার বদলে আরো প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্র সময় সোমবার সকালেই যুক্তরাষ্ট্রের শেয়ারবাজারে বড় ধস এবং তেলের দাম হঠাৎ বেড়ে যাওয়ার পর পরিস্থিতি সামাল দিতে ট্রাম্প একের পর এক সাংবাদিককে ফোন করেন। কিন্তু তার বক্তব্যে পরিষ্কার দিকনির্দেশনা না থাকায় বিভ্রান্তি আরো বেড়ে যায়।
তেলের দাম বৃদ্ধি নিয়ে নিউইয়র্ক পোস্ট-এর এক প্রতিবেদকের প্রশ্নের জবাবে ট্রাম্প বলেন, ‘সবকিছুর জন্যই আমার পরিকল্পনা আছে। আপনারা খুবই খুশি হবেন।’
অন্যদিকে সিবিএস নিউজকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি দাবি করেন, ‘যুদ্ধ কার্যত প্রায় শেষের পথে। যুদ্ধ প্রায় শেষ। আমরা সময়সূচির অনেক আগেই এগিয়ে আছি।’
যখন তাকে জিজ্ঞেস করা হয় যুদ্ধ দ্রুত শেষ হতে পারে কি না, তখন তিনি বলেন, ‘আমি জানি না। শেষ করা আমার মাথাতেই আছে, অন্য কারও নয়।’
তার এসব বক্তব্যের পর অন্তত অর্থনৈতিক দিক থেকে তাৎক্ষণিক প্রভাব দেখা যায়। শেয়ারবাজার কিছুটা ঘুরে দাঁড়ায় এবং দিনের শুরুতে ব্যারেলপ্রতি ১২০ ডলার পর্যন্ত উঠে যাওয়া তেলের দাম কমে ৯০ ডলারের নিচে নেমে আসে।
তবে কয়েকদিন আগেই ট্রাম্প বলেছিলেন, ইরানের ‘নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ’ না হওয়া পর্যন্ত যুদ্ধ বন্ধ হবে না। ট্রাম্পের বক্তব্যে মনে হচ্ছিল মধ্যপ্রাচ্যকে অস্থির করে তোলা এবং হরমুজ প্রণালির প্রায় সম্পূর্ণ জাহাজ চলাচল বন্ধ করে দেয়া এই সামরিক অভিযান হয়তো শেষের দিকে এগোচ্ছে। কিন্তু সন্ধ্যার দিকে আবারো অবস্থান বদলান ট্রাম্প।
তিনি বলেন, ‘এই মুহূর্তেই আমরা এটাকে অসাধারণ সাফল্য বলতে পারি। আবার চাইলে আরও এগোতেও পারি। আর আমরা আরও এগোব।’
তিনি দাবি করেন, যুক্তরাষ্ট্র এই সামরিক অভিযানের ‘সমাপ্তির খুব কাছাকাছি’ পৌঁছে গেছে। তবে একইসঙ্গে সতর্ক করেন, যদি ইরান পারস্য উপসাগর থেকে বের হওয়া তেলবাহী জাহাজগুলোকে হুমকি দিতে থাকে, তাহলে যুক্তরাষ্ট্র আরও তীব্র হামলা চালাবে।
‘আমরা এমনভাবে আঘাত করব যে তারা বা তাদের সহযোগীরা ওই অঞ্চলে পুনরুদ্ধারের সুযোগই পাবে না’ বলেন ট্রাম্প।
একইসঙ্গে যুদ্ধের লক্ষ্যও অনেক বিস্তৃতভাবে ব্যাখ্যা করেন তিনি। তার ভাষায়, ‘এ অভিযানের উদ্দেশ্য হচ্ছে ইরান যেন দীর্ঘ সময় ধরে যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল বা তাদের মিত্রদের বিরুদ্ধে ব্যবহারের মতো কোনো অস্ত্র তৈরি করতে না পারে।’
এ লক্ষ্য অর্জনের জন্য শেষ পর্যন্ত ইরানে শাসনব্যবস্থার পরিবর্তনও প্রয়োজন হতে পারে—এমন ইঙ্গিতও মিলেছে তার বক্তব্যে।
মাত্র কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে ট্রাম্পের বার্তা একাধিকবার পাল্টে যাওয়ায় যুদ্ধের প্রকৃত লক্ষ্য বা সময়সীমা নিয়ে অনিশ্চয়তা আরো গভীর হয়েছে।
যদিও গত রোববার এক সাক্ষাৎকারে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ অভিযানের পরবর্তী ধাপের ইঙ্গিত দেন। তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল আরো শক্তিশালী অস্ত্র ব্যবহার করতে পারে। তার ভাষায়, ‘সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে ৫০০, ১ হাজার ও ২ হাজার পাউন্ডের প্রচলিত বোমা ব্যবহার করে বড় আকারের অভিযান চালানোর সক্ষমতা আমাদের আছে। প্রকৃতপক্ষে আমরা সেই প্রচেষ্টা এখনো পুরোপুরি শুরুই করিনি।’
সোমবার ট্রাম্পকে যখন জিজ্ঞেস করা হয় তার বক্তব্য এবং হেগসেথের মন্তব্যের মধ্যে বিরোধ রয়েছে কি না, তখন তিনি বলেন, ‘দুটোই সত্য হতে পারে।’ এরপর তিনি বলেন, ‘এটা একটি নতুন দেশ গঠনের সূচনা।’
তবে ইরাক যুদ্ধের পর যেভাবে যুক্তরাষ্ট্র দেশ পুনর্গঠনের চেষ্টা করেছিল—সে ধরনের ‘নেশন-বিল্ডিং’ প্রক্রিয়ায় জড়াতে চান না বলেই অতীতে ট্রাম্প ও তার সহযোগীরা একাধিকবার জানিয়েছেন।
এদিকে যুদ্ধের অর্থনৈতিক প্রভাবও যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরে রাজনৈতিক চাপ তৈরি করছে। মঙ্গলবার যুক্তরাষ্ট্রের বিনিয়োগকারীরা ট্রাম্পের নতুন মন্তব্যের প্রভাব মূল্যায়ন করবেন। তবে বাজার স্থিতিশীল হলেও জ্বালানির দাম কমতে আরও সময় লাগতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।
বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রে প্রতি গ্যালন গ্যাসোলিনের গড় দাম দাঁড়িয়েছে ৩ দশমিক ৪৮ ডলার, যা এক সপ্তাহ আগের তুলনায় ৪৮ সেন্ট বেশি।
এর মধ্যেই অর্থনীতিতে দুর্বলতার লক্ষণ দেখা যাচ্ছে। গত শুক্রবার যুক্তরাষ্ট্রের শ্রম পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, ফেব্রুয়ারিতে দেশটিতে ৯২ হাজার কর্মসংস্থান কমেছে। বেকারত্বের হার বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪ দশমিক ৪ শতাংশে। শ্রমশক্তিতে অংশগ্রহণের হার ৬২ শতাংশে নেমে এসেছে, যা ২০২১ সালের ডিসেম্বরের পর সর্বনিম্ন।
আপনার মূল্যবান মতামত দিন: