রাশিয়ার সংসদীয় নির্বাচন শুরু

মুনা নিউজ ডেস্ক | ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ২২:৪৩

ফাইল ছবি ফাইল ছবি
শুক্রবার থেকে রোববার এই তিন দিন ধরে সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হচ্ছে রাশিয়ায়। ২০২২ সালে ইউক্রেনে পূর্ণাঙ্গ সামরিক অভিযান শুরুর পর এটিই দেশটির প্রথম সংসদ নির্বাচন। একই সময়ে ধীরগতির অর্থনীতি, মূল্যস্ফীতি এবং যুদ্ধক্ষেত্রের বাইরে ইউক্রেনীয় ড্রোন হামলার মুখে ভোট দিচ্ছেন রুশ নাগরিকরা। 
 
নির্বাচনে প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সমর্থক ক্ষমতাসীন দল ইউনাইটেড রাশিয়া আবারও পার্লামেন্টে নিজেদের প্রভাব ধরে রাখবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে সমালোচকদের দাবি, প্রকৃত বিরোধীদের নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সুযোগ না থাকায় ফলাফল অনেকটাই আগেই নির্ধারিত।
 
রাশিয়ার নিম্নকক্ষ স্টেট ডুমার ৪৫০টি আসনের জন্য ভোট হচ্ছে। এর পাশাপাশি স্থানীয় নির্বাচনও অনুষ্ঠিত হচ্ছে।
 
রাশিয়ার ১১টি অঞ্চলে গভর্নর এবং ৩৯টি অঞ্চলে আঞ্চলিক আইনসভার সদস্য নির্বাচিত হবেন। ভোটারদের অংশগ্রহণ বাড়াতে তিন দিন ধরে ভোট নেওয়া হচ্ছে। প্রায় ১১ কোটি ১০ লাখ ভোটার এতে ভোট দেওয়ার যোগ্য। ইলেকট্রনিক ভোট দেওয়ার সুযোগও রাখা হয়েছে।
 
স্টেট ডুমার অর্ধেক অর্থাৎ ২২৫টি আসন দলীয় তালিকার ভিত্তিতে এবং বাকি ২২৫টি একক আসনের সরাসরি প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়।
 
২০০১ সালে ক্রেমলিনপন্থি কয়েকটি দলের একীভূতকরণের মাধ্যমে ইউনাইটেড রাশিয়া গঠিত হয়। এরপর থেকেই দলটি পুতিনকে সমর্থন করে আসছে এবং রাশিয়ার পার্লামেন্টে আধিপত্য ধরে রেখেছে।
 
২০২১ সালের নির্বাচনে দলটি স্টেট ডুমার দুই-তৃতীয়াংশের বেশি আসনে জয় পায়। এবারের নির্বাচনেও দলটির আধিপত্য অব্যাহত থাকবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
 
ইউনাইটেড রাশিয়ার প্রার্থী তালিকার নেতৃত্বে রয়েছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই লাভরভ এবং মস্কোর মেয়র সের্গেই সোবিয়ানিন।
 
দলে নতুন মুখ যুক্ত করার প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে তালিকায় গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে রয়েছেন যুদ্ধবিষয়ক সাংবাদিক ইয়েভগেনি পডদুবনি। ইউক্রেনীয় ড্রোন হামলায় তিনি গুরুতর আহত হয়েছিলেন।
 
ইউনাইটেড রাশিয়ার সদস্যরা ইউক্রেনে যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়া এবং পুতিনের সর্বোচ্চ লক্ষ্যগুলো বাস্তবায়নের প্রতি সমর্থন জানিয়েছেন। ক্রেমলিন এই যুদ্ধকে ‘বিশেষ সামরিক অভিযান’ বলে অভিহিত করে।
 
ইউনাইটেড রাশিয়ার পাশাপাশি সরকারের সঙ্গে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে ভোট দেওয়া ‘সিস্টেমিক বিরোধী’ দলগুলোও নির্বাচনে রয়েছে।
 
লিবারেল ইয়াবলোকো পার্টি ছিল নিবন্ধিত দলগুলোর মধ্যে একমাত্র দল, যারা ইউক্রেন যুদ্ধের বিরোধিতা করছিল। শুরুতে দলটি নির্বাচনের ব্যালটে ছিল। তবে আগস্টে সুপ্রিম কোর্টের আদেশে দলীয় তালিকা থেকে তাদের সরিয়ে দেওয়া হয়।
 
আদালত বিভিন্ন কারণের মধ্যে দলটির যুদ্ধবিরোধী অবস্থানকে রাশিয়ার আঞ্চলিক অখণ্ডতা লঙ্ঘনের আহ্বানের সঙ্গে তুলনা করে। এখন ইয়াবলোকো শুধু একক আসনের নির্বাচনে প্রার্থী দিয়েছে।
 
রাশিয়ার কমিউনিস্ট পার্টিও বড় একটি রাজনৈতিক শক্তি। ৮২ বছর বয়সী গেন্নাদি জিউগানভ তিন দশকের বেশি সময় ধরে দলটির নেতৃত্ব দিচ্ছেন। তিনি সাবেক সোভিয়েত কর্মকর্তা।
 
পুতিনের ২৫ বছরের বেশি শাসনামলে কমিউনিস্ট পার্টি সরকারের বিভিন্ন নীতির সমালোচনা করলেও পুতিনকে সরাসরি আক্রমণ করা থেকে বিরত থেকেছে। ইউক্রেনে রাশিয়ার যুদ্ধকেও দলটি দৃঢ়ভাবে সমর্থন করে।
 
রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও স্বাধীন সাংবাদিক আলেকজান্ডার ব্রাতেরস্কি আল-জাজিরাকে বলেন, নির্বাচনে দ্বিতীয় অবস্থানে কে থাকবে, সেটিও নজরে রাখার মতো বিষয়।
 
তার মতে, কমিউনিস্ট পার্টি দ্বিতীয় হলে তা অর্থনৈতিক সংকট ও জীবনযাত্রার মান কমে যাওয়ায় ভোটারদের ক্ষোভের ইঙ্গিত হতে পারে।
 
লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টিও পার্লামেন্টে কিছুটা প্রভাব ধরে রাখতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। দলটি উগ্র জাতীয়তাবাদী অবস্থানের জন্য পরিচিত এবং ১৯৯০-এর দশকের শুরু থেকেই রুশ আইনসভায় গুরুত্বপূর্ণ উপস্থিতি রয়েছে। কমিউনিস্টদের মতো তারাও ইউক্রেন যুদ্ধের দৃঢ় সমর্থক এবং দলে বেশ কয়েকজন যুদ্ধফেরত সেনাসদস্য রয়েছেন।
 
এ ছাড়া ‘এ জাস্ট রাশিয়া’ ও ‘নিউ পিপল’সহ ছোট কয়েকটি দলও নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে। এ জাস্ট রাশিয়া প্রায় ২০ বছর ধরে রাশিয়ার রাজনীতিতে সক্রিয়। সামাজিক গণতান্ত্রিক এই দলটি সোভিয়েত আমলের প্রতি নস্টালজিক বয়স্ক ও মধ্যবয়সী ভোটারদের সমর্থনের জন্য কমিউনিস্ট পার্টির সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে। দলটিও ইউক্রেন যুদ্ধ সমর্থন করে।
 
২০২১ সালের নির্বাচনের আগে নিউ পিপল পার্টি গঠিত হয়। তরুণ ভোটার ও প্রযুক্তিবিদদের প্রতিনিধিত্বকারী উদারপন্থি দল হিসেবে নিজেদের অবস্থান তৈরির চেষ্টা করে তারা। ওই নির্বাচনে ৫ শতাংশের সামান্য বেশি ভোট পেয়ে দলটি পার্লামেন্টে ছোট একটি গোষ্ঠী গঠন করে।
 
ব্রাতেরস্কির মতে, নিউ পিপল অপেক্ষাকৃত উদারপন্থি এবং ক্রেমলিনের কিছু প্রযুক্তিবাদী ও তুলনামূলক শান্তিপন্থি ব্যক্তির সমর্থন রয়েছে দলটির প্রতি। ইয়াবলোকোকে ক্রেমলিন নিষিদ্ধ করার পর দলটিকে অনেকেই তার বিকল্প হিসেবে দেখছেন।
 
এ ছাড়া কমিউনিস্ট পার্টির ছোট প্রতিদ্বন্দ্বী কমিউনিস্টস অব রাশিয়া, পার্টি অব পেনশনর্স, গ্রিন পার্টি, পার্টি অব ডাইরেক্ট ডেমোক্রেসি এবং মাদারল্যান্ড পার্টিও আসন পেতে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছে।
 
দেখতে নিয়মিত নির্বাচন মনে হলেও ইউক্রেনে পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধ শুরুর পর এটাই প্রথম সংসদ নির্বাচন হওয়ায় এর রাজনৈতিক গুরুত্ব রয়েছে বলে মনে করেন ব্রাতেরস্কি।
 
আগস্টে ইউনাইটেড রাশিয়ার দলীয় কংগ্রেসে দেওয়া বক্তব্যে পুতিন দলটির প্রতি ইউক্রেন যুদ্ধে ‘বিজয়ের জন্য সবকিছু’ করার আহ্বান জানান। এর মাধ্যমে নির্বাচনকে যুদ্ধের প্রতি সমর্থনের সঙ্গেও যুক্ত করেছেন তিনি।
 
ব্রাতেরস্কির মতে, নির্বাচন ক্রেমলিনের জন্য উদ্বেগের কারণ হতে পারে। কারণ আইনি উপায়ে ক্রেমলিনের প্রতি অসন্তোষ প্রকাশের অন্যতম সুযোগ হচ্ছে ভোট।
 
২০০০ সালে পুতিন ক্ষমতায় আসার পর থেকে স্টেট ডুমার প্রতিটি নির্বাচনে ইউনাইটেড রাশিয়া জয় পেয়েছে। বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই বড় ব্যবধানে জয় পেয়েছে দলটি। তবে এসব নির্বাচনের ফল নিয়ে বারবার প্রশ্ন উঠেছে।
 
২০১১ সালের নির্বাচনে ভোট কারচুপির অভিযোগকে কেন্দ্র করে পুতিনের শাসনামলের সবচেয়ে বড় রাজপথের বিক্ষোভ শুরু হয়েছিল।
 
২০২১ সালের নির্বাচনের পর স্বাধীন পর্যবেক্ষক ও পরিসংখ্যানবিদরা দাবি করেন, সরকারি ফলাফলে দেখানো সংখ্যার তুলনায় ইউনাইটেড রাশিয়ার প্রকৃত জনসমর্থন অনেক কম ছিল।
 
তবে ব্যাপক ভোট কারচুপির অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছে রুশ কর্তৃপক্ষ। একই সময়ে বিরোধী দল এবং ইউক্রেন যুদ্ধের সমালোচকদের নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সুযোগ ক্রমেই সীমিত করা হয়েছে।