ছবি: গ্রাফিক্স
জাতিসংঘের নতুন বিশ্বমানচিত্র ব্যবহারে উৎসাহ দিয়ে সম্প্রতি একটি প্রস্তাব পাস করেছে সাধারণ পরিষদ। বিশ্বের বিভিন্ন মহাদেশের প্রকৃত আয়তন তুলনামূলকভাবে সঠিকভাবে তুলে ধরাই এই নতুন মানচিত্রের লক্ষ্য। তবে প্রস্তাবটি পাস হওয়ার পর মানচিত্রটির কিছু বিষয় নিয়ে আপত্তি তুলেছে ভারত, জাপান ও ইউক্রেন।
তবে তিন দেশই নতুন মানচিত্র ব্যবহারের নীতিগত বিরোধিতা করছে না। তাদের আপত্তি মূলত বিতর্কিত কিছু ভূখণ্ডকে মানচিত্রে কোন রং বা ছায়ায় দেখানো হয়েছে, তা নিয়ে।
আল জাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত সপ্তাহে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে নতুন মানচিত্র ব্যবহারে উৎসাহ দেওয়ার প্রস্তাবটি ১৬৪ ভোটে পাস হয়। ছয়টি দেশ ভোটদানে বিরত ছিল। একমাত্র যুক্তরাষ্ট্র প্রস্তাবের বিপক্ষে ভোট দেয়।
জাতিসংঘ যে মানচিত্র ব্যবহারে উৎসাহ দিচ্ছে, সেটি ‘ইকুয়াল আর্থ’ প্রজেকশন। বর্তমানে বহুল ব্যবহৃত ‘মারকেটর’ প্রজেকশনের তুলনায় এই মানচিত্রে বিভিন্ন মহাদেশের প্রকৃত আয়তন তুলনামূলকভাবে সঠিকভাবে দেখানো হয়।
১৫৬৯ সালে ফ্লেমিশ মানচিত্রবিদ জেরার্ডাস মারকেটর তৈরি করেছিলেন তাঁর নামের এই প্রজেকশন। গোল পৃথিবীকে সমতল কাগজে দেখাতে গিয়ে এতে মেরুর কাছের দেশ ও অঞ্চল বাস্তবের তুলনায় অনেক বড় দেখায়।
যেমন মারকেটর মানচিত্রে গ্রিনল্যান্ডকে প্রায় আফ্রিকার সমান বড় দেখানো হলেও বাস্তবে আফ্রিকার ভেতরে প্রায় ১৪টি গ্রিনল্যান্ডের আয়তন ধরে। একইভাবে ইউরোপকে দক্ষিণ আমেরিকার চেয়ে বড় মনে হলেও বাস্তবে ইউরোপ মহাদেশটি দক্ষিণ আমেরিকার প্রায় অর্ধেক।
আফ্রিকার প্রকৃত আয়তন ছোট করে দেখানোর কারণে দীর্ঘদিন ধরে এই মানচিত্রের সমালোচনা করে আসছেন মানচিত্রবিদ ও আফ্রিকার অধিকারকর্মীরা। তাদের মতে, এটি আফ্রিকা সম্পর্কে নেতিবাচক ধারণা তৈরিতেও ভূমিকা রাখে।
ইউক্রেন জাতিসংঘের প্রস্তাবে ভোটদানে বিরত থাকা ছয় দেশের একটি। দেশটির আপত্তি মূলত ক্রিমিয়াকে কীভাবে দেখানো হয়েছে, তা নিয়ে।
ইকুয়াল আর্থ মানচিত্রে রাশিয়ার দখলে থাকা ক্রিমিয়াকে ইউক্রেনের মূল ভূখণ্ডের তুলনায় আলাদা ও অপেক্ষাকৃত হালকা রঙে দেখানো হয়েছে। রাশিয়ার রঙের সঙ্গে ওই রঙের মিল থাকায় কিয়েভ উদ্বেগ জানিয়েছে।
জাতিসংঘ ২০১৪ সালে রাশিয়ার ক্রিমিয়া দখল ও সংযুক্তিকে নিন্দা করেছে। ইউক্রেনের জাতিসংঘ প্রতিনিধি আন্দ্রি মেলনিক বলেন, তাঁর দেশ নতুন মানচিত্রের মূল উদ্দেশ্যের বিরোধী নয়। তবে ভোটের আগে মানচিত্রে সংশোধনের অনুরোধ জানালেও ইতিবাচক সাড়া পাওয়া যায়নি।
জাপান নতুন মানচিত্রের পক্ষে ভোট দিয়েছে। তবে বৃহস্পতিবার দেশটি জানায়, রাশিয়ার ভূখণ্ড এবং বিতর্কিত কুরিল দ্বীপপুঞ্জকে একই রং ও ছায়ায় দেখানো হয়েছে।
কুরিল দ্বীপপুঞ্জের চারটি দ্বীপের মালিকানা নিয়ে রাশিয়া ও জাপানের দীর্ঘদিনের বিরোধ রয়েছে। রাশিয়ায় এগুলো ‘সাউদার্ন কুরিলস’ এবং জাপানে ‘নর্দার্ন টেরিটোরিজ’ নামে পরিচিত। বর্তমানে দ্বীপগুলো রাশিয়ার প্রশাসনের অধীনে।
জাপানের প্রধান মন্ত্রিপরিষদ সচিব মিনোরু কিহারা জানান, যুক্তরাষ্ট্রে থাকা জাপানি দূতাবাস ইকুয়াল আর্থের নির্মাতাদের কাছে মানচিত্রটি সংশোধনের অনুরোধ জানিয়েছে। তাঁর ভাষ্য, মানচিত্রে জাপান সরকারের অবস্থানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক উপস্থাপন দেখা যাচ্ছে, যা দেশের ভূখণ্ড ও ভৌগোলিক নাম নিয়ে ভুল ধারণা তৈরি করতে পারে।
ভারতও ইকুয়াল আর্থ প্রজেকশনের পক্ষে ভোট দিয়েছে। তবে পরে দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় কাশ্মীরের বিতর্কিত অঞ্চল কীভাবে দেখানো হবে, তা নিয়ে সতর্কতা জানিয়েছে।
ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল বলেন, জাতিসংঘের প্রস্তাব কোনো নির্দিষ্ট মানচিত্র ব্যবহারের বাধ্যবাধকতা তৈরি করেনি। তবে জম্মু ও কাশ্মীর এবং লাদাখসহ ভারতের সার্বভৌম ভূখণ্ড দেশটির সরকারি মানচিত্র অনুযায়ী দেখাতে হবে। এর বাইরে কোনো ভুল বা বিভ্রান্তিকর উপস্থাপন গ্রহণযোগ্য নয়।
কাশ্মীর নিয়ে ভারত ও পাকিস্তানের দীর্ঘদিনের বিরোধ রয়েছে। অঞ্চলটির কিছু অংশ পাকিস্তান ও কিছু অংশ ভারতের নিয়ন্ত্রণে। আবার কাশ্মীরের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের কিছু এলাকার ওপর চীনেরও দাবি রয়েছে।
ফলে নতুন বিশ্বমানচিত্রের উদ্দেশ্য মহাদেশগুলোর প্রকৃত আয়তন আরও নির্ভুলভাবে তুলে ধরা হলেও, বিতর্কিত ভূখণ্ডের উপস্থাপন নিয়ে এরই মধ্যে নতুন কূটনৈতিক সংবেদনশীলতা তৈরি হয়েছে।
এই বিভাগের অন্যান্য খবর