ফাইল ছবি
মিউনিখ নিরাপত্তা সম্মেলনের মধ্য দিয়ে ইউরোপীয় নেতাদের নতুন এক সিদ্ধান্তের ব্যাপারে আভাস দিয়েছেন ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ভন ডার লিয়েন। শনিবার সম্মেলনে তিনি বলেন, এমন কিছু সীমা লঙ্ঘিত হয়েছে, যা আর আগের অবস্থায় ফিরিয়ে আনা সম্ভব নয়।
প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ক্ষমতায় আসার এক বছরে মধ্যে টানাপড়েনের মুখোমুখি হয়েছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের মধ্যকার সম্পর্ক। এর মধ্যে গ্রিনল্যান্ডকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যুক্ত করার জন্যে ক্রমাগত ট্রাম্প প্রশাসন চাপে রাখছে ইউরোপকে। এতে ন্যাটোভুক্ত অঞ্চলের নিরাপত্তার বিষয়ে ওয়াশিংটন যে অঙ্গীকার করেছিল তা নিয়ে ইউরোপীয়দের মনে সন্দেহ বাড়ছে।
এদিকে সম্মেলনে পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও ইউরোপীয়দের তেমন আশ্বস্ত করতে পারেননি। তিনি বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র ইউরোপের সঙ্গে কাজ করতে আগ্রহী। ইউরোপের রাজনৈতিক নানা বিষয়ে সমালোচনা করলেও ন্যাটো এবং রাশিয়া ও ইউক্রেনের যুদ্ধের প্রসঙ্গ সচেতনভাবে এড়িয়ে যান রুবিও।
চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে রাশিয়া ও ইউক্রেনের মধ্যে চলমান যুদ্ধের পাঁচ বছর হতে যাচ্ছে। এ পরিস্থিতিতে ইউরোপীয় নেতারা ঘোষণা দিয়েছেন, তারা নিজেদের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা জোরদার করার প্রচেষ্টা চালিয়ে যাবেন এবং যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভরতা কমাবেন। যা ট্রাম্পের ধারণার সঙ্গে মিলে যাচ্ছে।
ট্রাম্প প্রশাসন জানিয়েছে, ভবিষ্যতে ইউরোপ মহাদেশের প্রথাগত প্রতিরক্ষার মূল দায়িত্ব ইউরোপই নেবে। বিনিময়ে ওয়াশিংটন ইউরোপের ওপর তাদের ‘নিউক্লিয়ার আমব্রেলা’ হয়ে থাকবে, অর্থ্যাৎ পারমাণবিক সুরক্ষা নিশ্চিত করবে। সঙ্গে ন্যাটোর পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তিও বজায় রাখবে।
সম্মেলনে জার্মান চ্যান্সেলর ফ্রিডরিখ মেৎর্স, ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাঁখোও ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার ন্যাটোর ভেতরে একটি শক্তিশালী ‘ইউরোপীয় স্তম্ভ’ গড়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। যা ট্রাম্প বা ভবিষ্যতে কোনো মার্কিন নেতা ইউরোপকে রক্ষা করতে এগিয়ে না আসলে, তার বিরুদ্ধে এই স্তম্ভ একটি রক্ষাকবচ হিসেবে কাজ করবে।
পাশাপাশি মেৎর্স ইউরোপের পারমাণবিক প্রতিরোধ ব্যবস্থা নিয়ে ম্যাক্রোঁর সঙ্গে ইতোমধ্যে আলোচনা শুরু করেছেন। ইউরোপে ফ্রান্সই একমাত্র দেশ যার স্বাধীন পারমাণবিক প্রতিরোধ ব্যবস্থা রয়েছে। কারণ ব্রিটেনের ট্রাইডেন্ট পারমাণবিক ক্ষেপণাস্ত্রগুলো যুক্তরাষ্ট্রেই তৈরি এবং রক্ষণাবেক্ষণও তাদের হাতে।
রাশিয়ার হুমকি এবং ট্রাম্পের ক্রমবর্ধমান চাপের ফলে ইউরোপীয় দেশগুলো তাদের প্রতিরক্ষা ব্যয় বাড়িয়েছে। এর প্রেক্ষিতে ন্যাটোভুক্ত দেশগুলো ২০২৫ সালে তাদের মূল প্রতিরক্ষা ব্যয় জিডিপির দুই শতাংশ থেকে বাড়িয়ে তিন দশমিক পাঁচ শতাংশে উন্নীত করতে সম্মত হয়েছে।
ইউরোপীয় দেশগুলো শক্তিশালী ও জটিল অস্ত্র ব্যবস্থা গড়ে তুলতে জোট গঠন করছে। ফ্রান্স, জার্মানি, ইতালি, পোল্যান্ড ও সুইডেনের প্রতিরক্ষামন্ত্রীরা বৃহস্পতিবার ‘ইউরোপীয় লং-রেঞ্জ স্ট্রাইক অ্যাপ্রোচ (ইএলএসএ)’কে এগিয়ে নিতে একটি সম্মতিপত্রে স্বাক্ষর করেছেন। যা মূলত গভীরভাবে আঘাত হানতে সক্ষম এমন ক্ষেপণাস্ত্র তৈরির একটি প্রকল্প। এছাড়া বৃহস্পতিবার ইউরোপীয় দেশগুলোর জোট ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষাসহ চারটি প্রকল্পে একসঙ্গে কাজ করতে সম্মত হয়েছে।
তবে অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বের ফলে সমগ্র ইউরোপে বড় কিছু প্রকল্প শুরু করাটাই কঠিন হয়ে পড়ছে। ফ্রেঞ্চ-জার্মান-স্প্যানিশ ফাইটার জেট প্রকল্প গত কয়েক মাস ধরে ঝুলে আছে। কারণ অংশীদার কোম্পানিগুলো কাজের বণ্টন নিয়ে একমত হতে পারছে না।
আবার ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রতিরক্ষা প্রকল্পগুলো কেবল ইইউ কোম্পানিগুলোর মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে, নাকি অন্যদের জন্যও উন্মুক্ত থাকবে এ নিয়ে তর্ক-বিতর্ক থামছেই না। ফলে প্রকল্পগুলোতে অচল হয়ে পড়ছে।
আপনার মূল্যবান মতামত দিন: