ফাইল ছবি
ওমানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের কর্মকর্তাদের মধ্যে পরোক্ষ আলোচনা শুরু হয়েছে। এতে ইরানের প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দিচ্ছেন দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি, আর যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধিদলের নেতৃত্বে রয়েছেন ট্রাম্পের বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ।
ফ্লাইট ট্র্যাকিং তথ্যের বরাতে জানা গেছে, উচ্চপদস্থ সামরিক কমান্ডারদের বহনে ব্যবহৃত একটি মার্কিন বিমানবাহিনীর বিমান আজ সকালে মাস্কাটে অবতরণ করেছে।
এর আগে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন জ্যেষ্ঠ আমেরিকান কর্মকর্তা জানিয়েছেন, আমেরিকান প্রতিনিধিদলে সেন্ট্রাল কমান্ডের প্রধান অ্যাডমিরাল ব্র্যাড কুপারও অন্তর্ভুক্ত রয়েছেন।
গত জুনে ইসরায়েলের সঙ্গে ১২ দিনের যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে ইরান। ওই যুদ্ধে ইরানের পারমাণবিক স্থাপনায় হামলা চালায় যুক্তরাষ্ট্র। এতে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণে ব্যবহৃত অনেক সেন্ট্রিফিউজ ধ্বংস হয় বলে দাবি করা হয়। একই সময় ইসরায়েলের হামলায় ইরানের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ও ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এ ঘটনার পর এটিই হতে যাচ্ছে দুই দেশের কর্মকর্তাদের প্রথম সরাসরি বৈঠক।
ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একজন মুখপাত্র বলেছেন, এ বৈঠকের লক্ষ্য হল ‘পারমাণবিক ইস্যুতে একটি ন্যায্য, পারস্পরিক সন্তোষজনক এবং সম্মানজনক চুক্তিতে পৌঁছানো।
তেহরানের স্পষ্ট আপত্তি সত্ত্বেও ট্রাম্প প্রশাসন ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির বাইরের বিষয়গুলো আলোচনার টেবিলে রাখার জন্য চাপ দিচ্ছে। তাই আলোচনার প্রকৃত বিষয়গুলো কী তা এখনো অস্পষ্ট।
বৈঠকের আগে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আরাঘচি বলেন, ইরান ‘চোখ খোলা রেখে’ এবং ‘গত এক বছরের অভিজ্ঞতা’ নিয়ে কূটনীতির পথে এগোচ্ছে। এক্সে (সাবেক টুইটার) এক পোস্টে তিনি লেখেন, আমরা সৎ উদ্দেশে আলোচনায় বসছি এবং আমাদের অধিকার নিয়ে দৃঢ় থাকব। প্রতিশ্রুতি অবশ্যই রক্ষা করতে হবে। তিনি আরো বলেন, সমান অবস্থান, পারস্পরিক সম্মান এবং পারস্পরিক স্বার্থ– এগুলো কোনো অলংকারপূর্ণ বক্তব্য নয়; এগুলো একটি টেকসই চুক্তির অপরিহার্য ভিত্তি।
বলা যায়, দুই দেশই এখনো নিজ নিজ অবস্থানে অনড়। তবে আলোচনায় অগ্রগতি হলে ভবিষ্যতে বিস্তৃত আলোচনার একটি কাঠামো তৈরি হতে পারে বলে আশা করা হচ্ছে।
ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি স্থগিত করা এবং সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুদ হ্রাস করার দাবি জানিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। তারা বলেছে, আলোচনায় ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র, আঞ্চলিক সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর প্রতি দেশটির সমর্থন এবং নাগরিকদের প্রতি তাদের আচরণের বিষয়টিও অন্তর্ভুক্ত করা উচিত। যদিও ইরান বলেছে, আলোচনা কেবল তার পারমাণবিক কর্মসূচির মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে। এই মতপার্থক্যগুলো কতটা সমাধান হয়েছে তা স্পষ্ট নয়। খুব শিগগিরই কোনো চুক্তিতে পৌঁছাতে না পারলে ইরানের ওপর বোমা হামলার হুমকি দিয়েছেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।
যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওসহ ওয়াশিংটনের শীর্ষ কর্মকর্তাদের মতে, গত মাসে দেশব্যাপী বিক্ষোভ ইরানের ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের পর সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। ৮৬ বছর বয়সী সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির শাসনের বিরুদ্ধে এ আন্দোলন দমন করতে গিয়ে নিরাপত্তা বাহিনীর অভিযানে কয়েক হাজার মানুষ নিহত এবং দশ হাজারের বেশি মানুষ গ্রেফতার হয়েছেন বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এ পরিস্থিতির মধ্যেই নতুন করে সামরিক হুমকি দেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। সম্প্রতি মধ্যপ্রাচ্যে বিমানবাহী রণতরী ইউএসএস আব্রাহাম লিংকনসহ একাধিক যুদ্ধজাহাজ ও যুদ্ধবিমান মোতায়েন করেছে যুক্তরাষ্ট্র। ফলে চাইলে ইরানের বিরুদ্ধে বড় ধরনের সামরিক অভিযান চালানোর সক্ষমতা ওয়াশিংটনের রয়েছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। তবে শুধু সামরিক হামলার মাধ্যমে ইরানের নীতিগত পরিবর্তন বা সরকার পতন সম্ভব হবে কি না, সে বিষয়ে অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে।
এদিকে উপসাগরীয় আরব দেশগুলো আশঙ্কা করছে, ইরানের ওপর কোনো হামলা হলে তা একটি বৃহত্তর আঞ্চলিক যুদ্ধে রূপ নিতে পারে। ইতোমধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের বাহিনী ইউএসএস আব্রাহাম লিংকনের কাছে একটি ইরানি ড্রোন ভূপাতিত করেছে। অন্যদিকে, হরমুজ প্রণালিতে একটি যুক্তরাষ্ট্রের পতাকাবাহী জাহাজ থামানোর চেষ্টা করেছে ইরান।
আটলান্টিক কাউন্সিলের গবেষক আলিসা পাভিয়ার মতে, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প আলোচনার মাধ্যমে সমাধানে পৌঁছাতে ইরানকে কোণঠাসা করতে চাইছেন। তিনি বলেন, দীর্ঘদিনের প্রক্সি যুদ্ধ, অর্থনৈতিক সংকট ও অভ্যন্তরীণ অস্থিরতায় ইরান এখন দুর্বল অবস্থানে রয়েছে। এ সুযোগ কাজে লাগিয়ে যুক্তরাষ্ট্র পারমাণবিক চুক্তিতে ছাড় আদায় করতে চায়।
আপনার মূল্যবান মতামত দিন: