আওয়ামী লীগ বিহীন প্রথম নির্বাচনে এগিয়ে বিএনপি—বলছে জরিপ

মুনা নিউজ ডেস্ক | ১১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ১৯:৩০

ছবি: গ্রাফিক্স ছবি: গ্রাফিক্স

আগামীকাল ১২ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। ২০০৮ সালের পর এটিই প্রথম প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচন বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা। দেশের ইতিহাসে এবারই প্রথম ব্যালটে নেই আওয়ামী লীগ।

২০২৪ সালের আগস্টে ছাত্র–নেতৃত্বাধীন গণ–অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর দেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় বড় পরিবর্তন আসে। সেই পরিবর্তিত প্রেক্ষাপটে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে এবারের নির্বাচন।

সাতটি জাতীয় জরিপের তথ্য বিশ্লেষণ করে ‘দ্য নিউইয়র্ক এডিটোরিয়াল’-এর পূর্বাভাস বলছে, ৩০০ আসনের সংসদে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) কার্যকর সংখ্যাগরিষ্ঠতার পথে। তবে ভোটের ব্যবধান ও আসনসংখ্যা নিয়ে অনিশ্চয়তা উল্লেখযোগ্য।

 

জরিপে কী বলছে জনমত

হাসিনা সরকারের পতনের পর পরিচালিত প্রতিটি জরিপেই জামায়াতে ইসলামীর তুলনায় বিএনপি এগিয়ে। তবে ব্যবধানের তারতম্য রয়েছে। ন্যারেটিভ/আইআইএলডির জরিপে দুই দলের ব্যবধান মাত্র ১.১ শতাংশ; অন্যদিকে ইনোভিশনের সর্বশেষ প্যানেল স্টাডিতে বিএনপি ২১.৮ পয়েন্টে এগিয়ে।

বিশ্লেষকদের মতে, পদ্ধতিগত পার্থক্যের কারণেই এই ভিন্নতা। ন্যারেটিভ কনসোর্টিয়ামের জরিপে ২৯৫ আসনে ২২ হাজার ১৭৪ জনের মতামত নেওয়া হয়েছে—যা একটি নির্দিষ্ট সময়ের চিত্র তুলে ধরে। বিপরীতে ইনোভিশনের প্যানেল স্টাডিতে পূর্ববর্তী ৫ হাজার ১৪৭ উত্তরদাতার সঙ্গে পুনরায় যোগাযোগ করা হয়েছে, যা সময়ের সঙ্গে মতামতের পরিবর্তন ধরতে সক্ষম।

 

আওয়ামী লীগের ভোট কোথায় যাচ্ছে

আওয়ামী লীগ অতীতে নিয়মিতভাবে ৩৫ থেকে ৪৮ শতাংশ ভোট পেয়েছে। এবার দলটির কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকায় প্রায় ৪ কোটি ভোটার নতুন রাজনৈতিক বিকল্প খুঁজছেন।

সিআরএফ/বিইপিওএস জরিপ বলছে, আওয়ামী লীগের সাবেক ভোটারের প্রায় অর্ধেক বিএনপির দিকে ঝুঁকছেন। এতে বিএনপির একক সংখ্যাগরিষ্ঠতার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। তবে জামায়াতও এ ভোটব্যাংকের একটি অংশ পাচ্ছে। প্রায় ৩০ শতাংশ সাবেক আওয়ামী ভোটার একটি ইসলামপন্থী দলকে সমর্থনের কথা জানিয়েছেন।

বিশ্লেষকদের মতে, স্থানীয় পর্যায়ে বিএনপির কঠোর রাজনৈতিক আচরণ কিংবা প্রতিবাদী মনোভাব—উভয় কারণেই এ স্থানান্তর ঘটতে পারে।


এফপিটিপি ব্যবস্থার প্রভাব

বাংলাদেশের ‘ফার্স্ট-পাস্ট-দ্য-পোস্ট’ (এফপিটিপি) পদ্ধতিতে যে প্রার্থী সর্বোচ্চ ভোট পান, তিনিই নির্বাচিত হন—ভোটের ব্যবধান যত কমই হোক। ফলে সামান্য ভোটের ব্যবধানও আসনে বড় ব্যবধানে রূপ নিতে পারে।

ন্যারেটিভ জরিপ অনুযায়ী, জাতীয়ভাবে জামায়াত যদি বিএনপির চেয়ে মাত্র ৩–৫ শতাংশ পিছিয়েও থাকে, তবু আসনের ব্যবধান ৬০–১০০ পর্যন্ত হতে পারে। কারণ, বিএনপির সমর্থন সারা দেশে বিস্তৃত; জামায়াতের ভোট নির্দিষ্ট অঞ্চলে কেন্দ্রীভূত।

তবে জামায়াতের সম্ভাব্য ২৯–৩৪ শতাংশ ভোটপ্রাপ্তির দাবি ঐতিহাসিক দৃষ্টিকোণ থেকে বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়। অতীতে দলটি কখনো ১২ শতাংশের বেশি ভোট বা ১৮টির বেশি আসন পায়নি।

 

ফল নির্ধারণে তিন নিয়ামক

১. বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী

মনোনয়ন না পেয়ে ৯২ জন নেতা ৭৯ আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়েছেন। অন্তত ৪৬ আসনে তাঁদের নিজস্ব ভোটব্যাংক রয়েছে। এতে ত্রিমুখী লড়াইয়ে ৩৫ শতাংশ ভোট পেলেও জয় সম্ভব—যা জামায়াতের পক্ষে যেতে পারে। মডেল বলছে, এতে বিএনপি ১৫–৩০ আসন হারাতে পারে।

২. তরুণ ভোটার

মোট ভোটারের ৪৪ শতাংশ জেন-জি। প্রথমবার ভোটারদের ৩৭.৪ শতাংশ জামায়াতপন্থী বলে জরিপে উঠে এসেছে। তরুণদের উপস্থিতি জাতীয় গড়ের চেয়ে ১০–১৫ শতাংশ বেশি হলে জামায়াতের আসন বাড়তে পারে উল্লেখযোগ্যভাবে।

৩. দোদুল্যমান ভোটার

১৫–৩৫ শতাংশ ভোটার এখনো সিদ্ধান্তহীন। ন্যারেটিভ জরিপে ১৭ শতাংশ দোদুল্যমান। এরা যদি সমানভাবে ভাগ হন, বিএনপি এগিয়ে থাকবে; কিন্তু ২:১ অনুপাতে জামায়াতের দিকে গেলে লড়াই নাটকীয় হয়ে উঠতে পারে।

 

আসন পূর্বাভাস (৩০০ আসন)

একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা: ১৫১

সম্ভাব্য পরিসর:

  • বিএনপি ও জোট: ১৫৫–২১৫

  • জামায়াত ও এনসিপি: ৫৫–১১০

  • জাতীয় পার্টি: ৫–১৮

  • ইসলামী আন্দোলন: ২–১০

  • অন্যান্য/স্বতন্ত্র: ১০–৩৫

কেন্দ্রীয় প্রাক্কলন:

  • বিএনপি: ১৮৫

  • জামায়াত: ৮০

  • জাতীয় পার্টি: ১০

  • ইসলামী আন্দোলন: ৫

  • অন্যান্য: ২০

 

সম্ভাব্য চার চিত্র

১. বিএনপির নিরঙ্কুশ জয় (৫০%)
আসন ১৮৫–২১৫। তরুণ ও দোদুল্যমান ভোট বিএনপির পক্ষে গেলে বড় ব্যবধানে জয়।

২. সামান্য ব্যবধানে বিএনপি জয় (২০%)
আসন ১৫৫–১৮৫। সরকার গঠনে জোটনির্ভরতা বাড়বে।

৩. ঝুলন্ত সংসদ (২০%)
বিএনপি ১৩০–১৫৫, জামায়াত ৯০–১১০। জোট–দরকষাকষির রাজনীতি শুরু।

৪. জামায়াত নেতৃত্বাধীন জোট (১০%)
তরুণ ভোটার উচ্চ উপস্থিতি ও বিএনপির ভোট বিভক্ত হলে সম্ভাবনা।

শেষ কথা

মূল পূর্বাভাস বলছে, বিএনপি প্রায় ১৮৫ আসন পেয়ে সরকার গঠন করতে পারে। জামায়াত পেতে পারে ইতিহাসের সেরা ফল—৬০ থেকে ১০০ আসন।

তবে নির্বাচনের অনিশ্চয়তা ‘কে জিতবে’ প্রশ্নে নয়; বরং ‘কত ব্যবধানে’—সে প্রশ্নে। ফল নির্ধারণ করবে ১৭ শতাংশ দোদুল্যমান ভোটার, বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থীদের প্রভাব এবং তরুণ ভোটারদের উপস্থিতি।

১২ কোটি ৮০ লাখ ভোটার আগামীকাল এমন এক রায় দেবেন, যা আগামী এক প্রজন্মের জন্য দেশের রাজনৈতিক মানচিত্রকে প্রভাবিত করতে পারে। জরিপে পাল্লা বিএনপির দিকে ভারী—তবে অপ্রত্যাশিত কিছু ঘটার সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।



আপনার মূল্যবান মতামত দিন: