ফাইল ছবি
আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি দেশে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। এবারের নির্বাচনে মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) ও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর মধ্যে। তবে এই নির্বাচনে বাংলাদেশের রাজনীতিতে দীর্ঘদিন প্রান্তিক অবস্থানে থাকা জামায়াতে ইসলামীর ব্যাপক উত্থান ঘটেছে। দলটির আমির ডা. শফিকুর রহমান হঠাৎ করেই দেশের প্রধানমন্ত্রী হওয়ার দৌড়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে উঠে এসেছেন।
ব্রিটিশ বার্তা সংস্থা রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রাজধানী ঢাকার বিভিন্ন পয়েন্টে পোস্টার-বিলবোর্ডে এখন শোভা পাচ্ছে সাদা দাড়িওয়ালা এই নেতার চেহারা, যেখানে ভোটারদের দেশের ‘প্রথম ইসলামপন্থী সরকারকে’ ক্ষমতায় আনার জন্য আহ্বান জানানো হচ্ছে।
৬৭ বছর বয়সী এই নেতা এতদিন মূলত ইসলামপন্থী মহলের বাইরে খুব বেশি পরিচিত ছিলেন না। কিন্তু দলের প্রধান হিসেবে তিনি এখন প্রধানমন্ত্রী হওয়ার লড়াইয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রার্থী হয়ে দাঁড়িয়েছেন।
এবারের নির্বাচনে জামায়াত ইসলামী তার প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী ও একসময়ের জোট শরিক বিএনপির বিরুদ্ধে শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতা গড়বে তুলবে বলে মনে করা হচ্ছে।
২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে জেন-জি নেতৃত্বাধীন গণ-অভ্যুত্থানের মুখে শেখ হাসিনা ক্ষমতা ছেড়ে ভারতে পালানোর পর বাংলাদেশের প্রথম সংসদ নির্বাচন হতে যাচ্ছে এটি।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, বাংলাদেশের ১৭ কোটি ৫০ লাখ মানুষের প্রায় ৯১ শতাংশই মুসলিম, যা এটিকে বিশ্বের অন্যতম বৃহত্তম মুসলিম-অধ্যুষিত দেশ হিসেবে প্রতিষ্ঠা দেয়। ইসলাম রাষ্ট্রধর্ম হলেও দেশটির সংবিধানে ধর্মনিরপেক্ষতার কথাও বলা আছে।
বিভিন্ন জনমত জরিপ বলছে, একসময় নিষিদ্ধ ঘোষিত জামায়াত, যারা ১৯৭১ সালে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিরোধিতা করেছিল, এবার তারা ইতিহাসের সবচেয়ে শক্তিশালী ফলাফল পেতে পারে। এ সম্ভাবনায় উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছেন দেশের মধ্যমপন্থী ও সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠী।
শেখ হাসিনার শাসনামলে ইসলামপন্থী গোষ্ঠীগুলোর বিরুদ্ধে কঠোর দমন-পীড়ন চালানো হয়। জামায়াতের অনেক শীর্ষ নেতা কারাবন্দি হন ও যুদ্ধাপরাধের অভিযোগ এনে দলটির বেশ কয়েকজন শীর্ষ নেতাকে ফাঁসি দেওয়া হয়। শেষমেষ দলটিকে নিষিদ্ধ করা হয় ও তারা কার্যত আন্ডারগ্রাউন্ডে (ভূগর্ভ) চলে যেতে বাধ্য হয়।
২০২২ সালে দলটির বর্তমান আমির ডা. শফিকুর রহমানকেও একটি নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠনকে সহযোগিতার অভিযোগে গ্রেফতার করা হয় ও তিনি ১৫ মাস কারাভোগ করেন।
তবে ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থান জামায়াত ও শফিকুর রহমানের ভাগ্য বদলে দেয়। সে বছরের আগস্টে শেখ হাসিনা ভারতে পালিয়ে যাওয়ার কয়েক দিনের মধ্যেই শান্তিতে নোবেলজয়ী অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে গঠিত অন্তর্বর্তীকালীন সরকার জামায়াতের ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা শিথিল করে। পরে ২০২৫ সালে আদালত দলটির নিষেধাজ্ঞা তুলে নেয়, ফলে বহু বছর গোপনে কার্যক্রম চালানো জামায়াত আবার প্রকাশ্যে কাজ করার সুযোগ পায়।
নিষেধাজ্ঞা উঠে যাওয়ার পর দলটি দ্রুত সক্রিয় হয়ে ওঠে, মানবিক সহায়তা কার্যক্রম, বন্যা-ত্রাণসহ বিভিন্ন উদ্যোগে মাঠে নামে। সবসময় সাদা পোশাক ও সাদা দাড়ি শোভিত শফিকুর রহমান এসব কর্মকাণ্ডে অত্যন্ত দৃশ্যমান হয়ে ওঠেন।
গত বছরের ডিসেম্বরে রয়টার্সকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে শফিকুর রহমান বলেন, আমরা বারবার চেষ্টা করেছি আমাদের কথা বলার, কিন্তু আমাদের দমন করা হয়েছে। গণ-অভ্যুত্থানের পর আমরা আবার উঠে আসার সুযোগ পেয়েছি।
জামায়াত তাদের নেতাকে একজন বিনয়ী, আন্তরিক ব্যক্তি হিসেবে বর্ণনা করে, যিনি সরলতা, শৃঙ্খলা, সহজ প্রবেশযোগ্যতা ও সাধারণ জীবনযাপনে বিশ্বাসী।
রাজনৈতিক শূন্যতার সুযোগ কাজে লাগিয়েছেন ডা. শফিকুর রহমান
বিশ্লেষকদের মতে, গণ-অভ্যুত্থানের পর সৃষ্ট রাজনৈতিক শূন্যতা দক্ষতার সঙ্গে কাজে লাগিয়েছেন ডা. জামায়াত আমির ডা. শফিকুর রহমান। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) বিশ্ব ধর্ম ও সংস্কৃতি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক শফি এমডি মোস্তফার ভাষায়, অভ্যুত্থানের পর প্রথম এক মাস দেশে তেমন কোনও দৃশ্যমান নেতা ছিল না। বিএনপির বর্তমান চেয়ারম্যান তারেক রহমান তখন লন্ডনে নির্বাসনে ছিলেন।
এই অধ্যাপক বলেন, শফিকুর রহমান সারাদেশ ভ্রমণ করেন ও গণমাধ্যমে ব্যাপক নজর কাড়েন। মাত্র দুই বছরের মধ্যেই তিনি অন্যতম শীর্ষ প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে ওঠেন।
নির্বাচনী প্রচারণায় জামায়াত আমিরের বক্তব্য অনেক ভোটারের মধ্যে সাড়া ফেলছে, যেখানে জামায়াত নিজেদের পরিচয় দিচ্ছে ইসলামি মূল্যবোধনির্ভর ‘পরিচ্ছন্ন, নৈতিক বিকল্প’ হিসেবে। গত ডিসেম্বরেই দলটি জাতীয় নাগরিক কমিটির (এনসিপি) সঙ্গে জোট গঠন করেছে, যা তরুণ ও অপেক্ষাকৃত কম রক্ষণশীল ভোটারদের কাছে তাদের গ্রহণযোগ্যতা বাড়িয়েছে।
এমনকি শফিকুর রহমানকে নিয়ে গেম অব থ্রোনস থেকে অনুপ্রাণিত প্রচারণা পোস্টারও দেখা যাচ্ছে, যেখানে লেখা ‘দাদু ইজ কামিং’। এর মাধ্যমে তাকে একজন সহজ ও বন্ধুসুলভ ব্যক্তি হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে।
অবশ্য অনেকে আবার জামায়াত আমিরকে ‘আরও মধ্যপন্থী’ একজন ব্যক্তিত্ব হিসেবে দেখছেন, যিনি সুষ্ঠু শাসনব্যবস্থা, দুর্নীতি দমন ও সামাজিক ন্যায়বিচারের ওপর জোর দিয়ে দলের ভাবমূর্তি বজায় রাখার চেষ্টা করেছেন। আবার তিনি সব ধর্মের প্রতি সমান আচরণের প্রতিশ্রুতিও দিয়েছেন।
ডা. শফিকুর রহমান বলেন, জামায়াত ‘মধ্যপন্থী, নমনীয়, যুক্তিসঙ্গত। কিন্তু আমাদের নীতিমালা ইসলামি ও কোরআনভিত্তিক মূল্যবোধের ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠা। তিনি বলেন, কোরআন শুধু মুসলমানদের জন্য নয়, সমগ্র সৃষ্টির জন্য।
তবে নারীদের নিয়ে তার একটি মন্তব্য ব্যাপক বিতর্ক তৈরি করেছে। তাছাড়া দলটি এবার একজনও নারী প্রার্থী দেয়নি।
নারীদের নিয়ে জামায়াতের আমির বলেছেন, নারীরা যেন দিনে পাঁচ ঘণ্টার বেশি কাজ না করেন যাতে তারা পারিবারিক দায়িত্বকে অগ্রাধিকার দিতে পারেন।
আপনার মূল্যবান মতামত দিন: