যুক্তরাষ্ট্র-ইউরোপ উত্তেজনার মধ্যে শুরু মিউনিখ নিরাপত্তা সম্মেলন

মুনা নিউজ ডেস্ক | ১১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ২১:১৫

ফাইল ছবি ফাইল ছবি

জার্মানির মিউনিখে শুক্রবার থেকে শুরু হচ্ছে তিন দিনব্যাপী মিউনিখ নিরাপত্তা সম্মেলন (এমএসসি)। এবারের সম্মেলন উপলক্ষে তৈরি করা এমএসসি রিপোর্ট ওয়াশিংটনকে নাখোশ করেছে। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প হোয়াইট হাউসে এক পর্যালোচনা বৈঠকে ইউরোপের প্রতি ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন।

মূলত গ্রিনল্যান্ড নিয়ে আগে থেকেই ইউরোপের প্রতি বিরক্ত হয়ে আছেন ট্রাম্প। ইউরোপও ট্রাম্পের হুমকি ও পদক্ষেপে ক্ষুব্ধ। এ অবস্থায় এবারের মিউনিখ সম্মেলনটি ট্রান্স-আটলান্টিক জোটের (যুক্তরাষ্ট্র-ইউরোপ) জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষজ্ঞরা প্রশ্ন তুলেছেন, মিউনিখে দুপক্ষের নেতারা কি চলমান কূটনৈতিক অস্বস্তি দূর করতে পারবেন? ক্ষতিগ্রস্ত সম্পর্ক পুনরুদ্ধারের প্রত্যাশাও করছেন নেতারা।

গত বছরের মিউনিখ সম্মেলনে যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স অত্যন্ত কড়া ভাষায় ইউরোপের সমালোচনা করেছিলেন। বিশেষ করে ভ্যান্স অভিবাসনের ক্ষেত্রে ইউরোপের উদারনৈতিক চিন্তাধারাকে আক্রমণ করে কথা বলেছিলেন।

এবারের সম্মেলনে ভ্যান্স অংশ নিচ্ছেন না। পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা মার্কো রুবিও যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দেবেন। সম্মেলনে ৫০ জনেরও বেশি বিশ্বনেতাকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। সম্মেলনটি এমন সময় অনুষ্ঠিত হচ্ছে, যখন ইউরোপের নিরাপত্তা ক্রমশ অনিশ্চয়তার দিকে যাচ্ছে।

বিবিসি জানায়, ট্রাম্প ক্রমশ বিশ্বব্যবস্থাকে উল্টে দিয়েছেন। মিত্র ও শত্রু উভয়ের ওপরই শাস্তিমূলক শুল্ক আরোপ করেছেন। ভেনেজুয়েলার ওপর নির্লজ্জ অভিযান চালানো হয়েছে। মস্কোর অনুকূল শর্তে ইউক্রেনে শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য অসম প্রচেষ্টাও চালিয়েছে ওয়াশিংটন। এমনকি কানাডাকে যুক্তরাষ্ট্রের ‘৫১তম প্রদেশ’ করার একটি অদ্ভুত দাবিও তুলেছিলেন ট্রাম্প।

ট্রাম্প সর্বশেষ যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তা কৌশলে (এনএসএস) ইউরোপকে ‘নিজের পায়ে দাঁড়াতে’ এবং ‘নিজের প্রতিরক্ষার জন্য প্রাথমিক দায়িত্ব’ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। ইউরোপের প্রতিরক্ষাকে সমর্থন করতে ক্রমশ অনিচ্ছুক হয়ে পড়েছে যুক্তরাষ্ট্র।

সর্বশেষ গ্রিনল্যান্ডের সংকটই যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের মধ্যে সমগ্র ট্রান্স-আটলান্টিক জোটের কাঠামোকে সত্যিই বড় ধাক্কা দিয়েছে। ডোনাল্ড ট্রাম্প অসংখ্যবার বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র ও বিশ্বের নিরাপত্তার স্বার্থে গ্রিনল্যান্ডের ‘মালিকানা’ ওয়াশিংটনের হাতে থাকা প্রয়োজন। এমনকি শক্তি প্রয়োগের হুমকিও দিয়েছেন।

গ্রিনল্যান্ড সংকট আপাতত এড়ানো গেছে। তবে এটি মিউনিখ সম্মেলনে একটি অস্বস্তিকর প্রশ্ন ঝুলিয়ে রেখেছে, তা হলো- ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া ইউরোপ-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্ক কি পুনরুদ্ধার হবে?

এবারের এমএসসি প্রতিবেদনে যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে কড়া সমালোচনা করা হয়েছে। বিশেষ করে বিশ্বব্যবস্থা বদলে দিতে ট্রাম্পের আগ্রাসী পদক্ষেপের সমালোচনা করা হয়েছে। প্রতিবেদনে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে আলোকপাত করা হয়েছে।

১. বিশ্ব এখন এমন এক পর্যায়ে প্রবেশ করছে, যেখানে ‘ধ্বংসাত্মক রাজনীতি’ প্রতিষ্ঠা করা হচ্ছে; যা আন্তর্জাতিক ব্যবস্থাকে চ্যালেঞ্জ করছে।
২. ১৯৪৫-পরবর্তী যে আন্তর্জাতিক শৃঙ্খলা যুক্তরাষ্ট্র গড়ে তুলেছিল, সেই ব্যবস্থার প্রতিই এখন ওয়াশিংটনের অঙ্গীকার নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।
৩. যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক অস্থিরতা তার বৈদেশিক নীতিকে অনিশ্চিত করে তুলছে।
৪. ট্রান্স-আটলান্টিক সম্পর্কের ভবিষ্যৎ নিয়ে ইউরোপে গভীর উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
৫. ন্যাটো ও ইউক্রেন-সংক্রান্ত নীতিতে সম্ভাব্য পরিবর্তন ইউরোপীয় নিরাপত্তা কাঠামোর জন্য বড় পরীক্ষা হয়ে উঠতে পারে।
৬. বিশ্ব রাজনীতিতে ক্ষমতার ভারসাম্য দ্রুত বদলাচ্ছে এবং যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা এখন আর আগের মতো পূর্বানুমেয় নয়।
৭. মিত্রদের সঙ্গে পরামর্শ ও বহুপাক্ষিক সহযোগিতা দুর্বল হলে বৈশ্বিক স্থিতিশীলতা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
৮. ইউরোপকে তার নিরাপত্তা ও কৌশলগত সক্ষমতা বাড়ানোর বিষয়টি গুরুত্ব সহকারে বিবেচনা করতে হবে।

যুক্তরাজ্যের সিক্রেট ইন্টেলিজেন্স সার্ভিস এম-সিক্সটিনের সাবেক প্রধান স্যার অ্যালেক্স ইয়োঙ্গার বলেন, ট্রান্স-আটলান্টিক জোট আগের অবস্থায় ফিরে যাবে না, তবে ভেঙে যায়নি।

অ্যালেক্স মনে করেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে নিরাপত্তা, সামরিক ও গোয়েন্দা সম্পর্ক থেকে ইউরোপ এখনও উপকৃত হচ্ছে। যদিও ট্রাম্প ইউরোপের ওপর নিজস্ব নিরাপত্তা চাপিয়ে দিতে চেষ্টা করছেন।

বাণিজ্য, অভিবাসন ও বাকস্বাধীনতার বিষয়ে ইউরোপের সঙ্গে ট্রাম্প প্রশাসনের বেশ পার্থক্য আছে। ইতোমধ্যে রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে ট্রাম্পের সম্পর্ক এবং রাশিয়ার আক্রমণের জন্য ইউক্রেনকে দোষারোপ করার প্রবণতা দেখে গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত ইউরোপীয় সরকারগুলো উদ্বিগ্ন।

এবারের মিউনিখ সম্মেলনের গবেষণা ও নীতি বিষয়ক পরিচালক টোবিয়াস বুন্ডে বলেছেন, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলের সঙ্গে এখন একটি মৌলিক পার্থক্য দেখা দিয়েছে। ট্রাম্প প্রশাসনের অধীনে অর্থনৈতিক একত্রীকরণ, গণতন্ত্র এবং মানবাধিকার কেবল মূল্যবোধ নয়, বরং কৌশলগত সম্পদে পরিণত হয়েছে। এগুলো ট্রাম্প প্রশাসনকে প্রকাশ্যে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে।

যুক্তরাষ্ট্রের ব্যাপারে এবারের এমএসসি রিপোর্টে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের প্রকৃত মনোভাবের ব্যাপারে ইউরোপ এখন আরও স্পষ্ট। ট্রাম্পের পদক্ষেপে ইউরোপের বেশিরভাগ মানুষ ক্রমবর্ধমান উদ্বেগের মধ্যে আছে।

পাশাপাশি ইউরোপ মনে করে, ট্রাম্পের এই প্রতিযোগিতামূলক কর্তৃত্ববাদে যুক্তরাষ্ট্রের পতন ঘটতে পারে। এ ধরনের পদক্ষেপে যুক্তরাষ্ট্রের গণতন্ত্র হুমকির মুখে পড়েছে বলেও মনে করে ইউরোপ।

রিপোর্টে বলা হয়েছে, উদারনৈতিক চিন্তাধারা থেকে যুক্তরাষ্ট্র মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে। ট্রাম্পের নীতির সমর্থকরা বিশ্বাস করেন, ট্রাম্পের পদক্ষেপ ‘আমেরিকাকে আবার মহান করে তুলবে’। অথচ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ট্রাম্পের নীতি একটি পরাশক্তিকে আত্মহত্যার দিকে ঠেলে দিচ্ছে।

প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, ইউরোপীয় নেতারা বুঝতে পেরেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীর ওপর নির্ভরতার দিন শেষ হয়ে আসছে।



আপনার মূল্যবান মতামত দিন: