ফাইল ছবি
ভারতে কয়েক মাস ধরে নাগরিকত্ব শনাক্ত নিয়ে বিশেষ কর্মসূচি চলছে। এর অংশ হিসেবে অবৈধভাবে বসবাসকারী অভিবাসী হিসেবে আটকের পর অনেককে সীমান্ত পার করে বাংলাদেশে পাঠানো হচ্ছে। এছাড়া বিভিন্ন ক্যাম্পে আটক রাখার ঘটনাও ঘটছে।
এ কার্যক্রম নিয়ে ব্যাপক বিতর্কের মধ্যেই নতুন পদক্ষেপ নিয়েছে দেশটির মহারাষ্ট্র প্রশাসন। বেআইনিভাবে বসবাসকারী বাংলাদেশি এবং রোহিঙ্গাদের চিহ্নিত করতে এআই বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করবে তারা। খবর বিবিসির।
বিশেষ অভিযানের অংশ হিসেবে অবৈধ অভিবাসী সন্দেহে মহারাষ্ট্রের বিভিন্ন বাসিন্দার নথিপত্র যাচাই করছে পুলিশ। এরপর বেআইনিভাবে সেখানে বসবাসকারী বাংলাদেশি ও রোহিঙ্গা চিহ্নিত করতে এআই কাজে লাগানোর কথা বলা হয়েছে।
এনডিটিভির এক অনুষ্ঠানে সম্প্রতি মহারাষ্ট্রের মুখ্যমন্ত্রী দেভেন্দ্র ফডনবীশ ঘোষণা করেন যে, মুম্বাই প্রশাসনের হয়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে বাংলাদেশি ও রোহিঙ্গা চিহ্নিত করার কাজটি করছে ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি (আইআইটি)।
তবে প্রযুক্তিটি কীভাবে ব্যবহার করা হবে, তা এখনও স্পষ্ট নয়। এ বিষয়ে আইআইটি মুম্বাইয়ের কাছ জানতে চাওয়া হলেও কোনো প্রশ্নের জবাব তাৎক্ষণিক পাওয়া যায়নি।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বিশেষজ্ঞরা ধারণা করছেন যে, সম্ভবত একজন বাংলাদেশি বা একজন রোহিঙ্গা কীরকম দেখতে হন, তারা কীভাবে কথা বলেন, কেমন পোশাক পরেন, কোন অঞ্চলের বাসিন্দা- এরকম নানা তথ্য দেওয়া থাকবে এআই টুলকে।
এছাড়া তাদের সঙ্গে বাংলায় কথা বলার ধরনও শেখানো হবে যন্ত্রকে। তবে এ প্রক্রিয়ায় নির্ভুলভাবে বাংলাদেশি বা রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশকারী চিহ্নিত করা প্রায় অসম্ভব বলে মন্তব্য করেছেন এআই বিশেষজ্ঞরা।
দীর্ঘদিন ধরে নাগরিকত্ব নিয়ে আন্দোলন ও গবেষণা করা অর্থনীতিবিদ প্রসেনজিৎ বসু প্রশ্ন তুলছেন, ‘কোটি কোটি টাকা খরচ করে বিভিন্ন রাজ্যে তো ভোটার তালিকায় নিবিড় সংশোধন করা হয়েছে বা কাজ চলছে, সেখানে কতজন বাংলাদেশি বা রোহিঙ্গা পাওয়া গেল?
সেই হিসাব আগে সরকারগুলো দিক। এসআইআরের (ভোটার তালিকা সংক্রান্ত বিশেষ কর্মসূচি) মতো প্রক্রিয়াতেও বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারী বা রোহিঙ্গা পাওয়া গেল না, আর এখন আবার এআই টুল আনা হচ্ছে। পুরোটাই একটা মিথ্যাচার।
মহারাষ্ট্রের মুখ্যমন্ত্রী গত জানুয়ারির মাঝামাঝি এনডিটিভির এক অনুষ্ঠানে বক্তব্য দিতে গিয়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে বাংলাদেশি ও রোহিঙ্গা চিহ্নিত করার বিষয়টি জানিয়েছিলেন।
এনডিটিভির ওয়েবসাইটে ওই খবরের প্রতিবেদনে লেখা হয়েছে: ‘মুখ্যমন্ত্রী ফডনবীশ বলেছেন, একটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার টুল তৈরি করা হচ্ছে, যেটা দিয়ে রাজ্যে বেআইনি বাংলাদেশি ও রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশকারীদের চিহ্নিত করা যাবে।’
প্রতিবেদনে আরও লেখা হয়েছে যে, এআই টুলটি আইআইটি মুম্বাইয়ের সঙ্গে যৌথভাবে তৈরি করা হচ্ছে এবং এখন সেটি ৬০ শতাংশ নির্ভুল ভাবে কাজ করছে। চার মাসের মধ্যে সেটি শতভাগ নির্ভুলভাবে কাজ করবে।
কলকাতা ভিত্তিক ‘মিডিয়াস্কিল্স ল্যাব’– এর প্রতিষ্ঠাতা ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বিশেষজ্ঞ জয়দীপ দাশগুপ্ত বলেন, ‘আমরা এটাকে লার্জ ল্যাঙ্গুয়েজ মডেল বলি, যেখানে ছবি, ভিডিও, মানচিত্র, অডিও, ইনফোগ্রাফিক্স, গবেষণাপত্র– যত তথ্য পাওয়া যায়– সব ফিড করে রাখা হয়। মহারাষ্ট্র যে টুলটি বানাচ্ছে, সেখানেও সম্ভবত এগুলো সবই ব্যবহার করা হবে। ’
তার কথায়, ‘ধরুন যন্ত্রকে শিখিয়ে দেওয়া হবে যে একজন টিপিকাল বাংলাদেশি মুসলমান কেমন দেখতে হন– তিনি টুপি পরেন কিনা, গোঁফ ছাড়া দাড়ি রাখেন কিনা বা নারীদের ক্ষেত্রে বোরকা পরেন কিনা, কীভাবে কথা বলেন– হয়ত এসব তথ্য শেখানো হবে। সেগুলোর ওপরে ভিত্তি করে যন্ত্র ঠিক করবে যে একজন ব্যক্তি বাংলাদেশি না রোহিঙ্গা না ভারতীয়। অর্থাৎ বাংলাদেশি ও রোহিঙ্গাদের প্রোফাইল ঠিক করা হবে সম্ভবত।’
তিনি আরও বলেন, কিন্তু এখানে সমস্যাটা হচ্ছে একই ধরনের দাড়ি রাখা বা টুপি পরা তো ভারতের বাংলাভাষী মুসলমানেরও অভ্যাস। আবার বহু হিন্দুও তো দাড়ি রাখেন, নানা ধরনের টুপি পরেন। তাহলে যন্ত্র একজন বাংলাদেশি মুসলমানের সঙ্গে একজন ভারতীয় মুসলমান বা ভারতীয় হিন্দুর পার্থক্য বুঝবে কী করে?’
মহারাষ্ট্রে এআই প্রযুক্তি দিয়ে নাগরিকত্ব শনাক্তের উদ্দেশ্য নিয়ে প্রশ্ন তুলে তথ্য প্রযুক্তি ক্ষেত্রের বড় বহুজাতিক কোম্পানির প্রিন্সিপাল সায়েন্টিস্ট অরিজিৎ মুখার্জী বলেন, ‘বাংলাদেশি বা রোহিঙ্গা চিহ্নিত করার জন্য যে তথ্য দেওয়া হবে যন্ত্রকে, সেখানে কোনো রাজনৈতিক উদ্দেশ্য কাজ করবে না তো’।
তিনি বলেন, ‘কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সবকিছুই নির্ভর করে তাকে কী ধরনের তথ্য দেওয়া হচ্ছে, যাকে আমরা ট্রেনিং ডেটা বলি, তার ওপরে। এ ধরনের একটা কাজ করতে গেলে লাখ লাখ কথার নমুনা শেখাতে হবে যন্ত্রকে। সেগুলোর পৃথকীকরণ কারা করবে? সেখানে যে রাজনৈতিক পক্ষপাত হবে, তা নিশ্চিতভাবেই বলা যায়। তাই ফলাফলও পক্ষপাতদুষ্ট হবে।’
বাংলাদেশ আর ভারতের সীমান্তবর্তী রাজ্যগুলোতে অনেক জায়গাতেই বাংলা ভাষায় কথা বলেন মানুষ। যেমন বাংলাদেশের সিলেট অঞ্চলের ভাষায় ভারতের ত্রিপুরা বা আসামের বরাক উপত্যকার বহু মানুষ কথা বলেন। একইভাবে রাজশাহীর দিকে যে ভাষায় কথা বলা হয়, পশ্চিমবঙ্গের মুর্শিদাবাদ অঞ্চলের মানুষের মুখের ভাষাও এক।
আবার ভারতের মধ্যেও একেকটি অঞ্চলের বাঙালিদের মুখের ভাষা একেকরকম। পশ্চিমবঙ্গের পুরুলিয়া জেলার মানুষ যেভাবে কথা বলেন, তা কলকাতার মানুষের কথার থেকে আলাদা। আবার কলকাতার মানুষের মুখের ভাষার সঙ্গে উত্তরাঞ্চলীয় শিলিগুড়ির মানুষের কথা বলার ধরন ভিন্ন।
সায়েন্টিস্ট অরিজিৎ বলেন, পশ্চিমবঙ্গের কোচবিহার আর বাংলাদেশের লালমনিরহাটের মানুষের মুখের ভাষা কি আলাদা করা যায়? মানুষের কথা বলার ভাষা তো আর রাজনৈতিক সীমারেখা মানে না। তাই এআই দিয়ে ‘বাংলাদেশিদের মুখের ভাষা’ আলাদাভাবে চেনা স্বপ্নই থেকে যাবে।
রাজনৈতিক পক্ষপাতিত্বের আশঙ্কা
এআই বিশেষজ্ঞদের কথায় বোঝা যাচ্ছে, যেভাবে একজন ব্যক্তিকে বাংলাদেশি বলে চিহ্নিত করা হতে পারে, সেখানে যে ভারতীয় মুসলমান– এমনকি ভারতীয় হিন্দুও ‘অবৈধ অনুপ্রবেশকারী’ হিসেবে চিহ্নিত হয়ে যেতে পারেন।
নাগরিকত্ব ইস্যু নিয়ে যারা আন্দোলন করছেন কয়েক বছর ধরে, তারা প্রশ্ন তুলছেন, পশ্চিমবঙ্গসহ বিভিন্ন রাজ্যে তো ভোটার তালিকার নিবিড় সংশোধন বা এসআইআর প্রক্রিয়া চলছে– তাতে কত বাংলাদেশি বা রোহিঙ্গা খুঁজে বের করা গেছে? এখন এআই টুল দিয়ে কি আদৌ বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারী সঠিকভাবে শনাক্ত করা যাবে?
অর্থনীতিবিদ ও সদ্য কংগ্রেস দলে যোগ দেওয়া প্রসেনজিৎ বসু বলেন, ‘বহু অর্থ ব্যয় করে তো পশ্চিমবঙ্গ, উত্তর প্রদেশ, তামিলনাড়ুসহ বিভিন্ন রাজ্যে এসআইআর বা নাগরিকত্ব যাচাই করা হচ্ছে অনুপ্রবেশকারী চিহ্নিত করার জন্য! কত জনকে ধরা গেল– সেই হিসাব দেওয়া হোক আগে।’
গত প্রায় ১০ মাসে একাধিক প্রতিবেদন প্রকাশ হয়েছে যেখানে দেখা গেছে, পশ্চিমবঙ্গ ও আসামের বাংলাাভাষী মুসলমানদের বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারী সন্দেহে আটক করে রাখা হয়েছে, অনেককে আইনসিদ্ধ পদ্ধতির বাইরে গিয়ে বাংলাদেশে ঠেলে পাঠানো হয়েছে।
যদিও যাদের বাংলাদেশে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে, তাদের অনেকে সত্যিই বেআইনিভাবে ভারতে বসবাস করছিলেন, কিন্তু একাধিক ঘটনায় প্রমাণ পাওয়া গেছে যে, সত্যিকারের ভারতীয় বাংলাভাষী মুসলমানদেরও ‘অনুপ্রবেশকারী’ তকমা দিয়ে বাংলাদেশে ঠেলে পাঠানো হয়েছে।
আপনার মূল্যবান মতামত দিন: