সিআইএ এবং এফবিআই-এর স্পাই আটক হলেন আইসিই-এর হাতে

মুনা নিউজ ডেস্ক | ২১ আগস্ট ২০২৬ ১৯:২১

ছবি: গ্রাফিক্স ছবি: গ্রাফিক্স
বিভিন্ন যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা সংস্থার হয়ে স্পাইয়ের দায়িত্ব পালন করেও রেহাই পেলেন না বেলেরিম স্কোরো। কসোভোয়ো জন্ম নেওয়া স্কোরোকে আটক করেছে ইমিগ্রেশন অ্যান্ড কাস্টমস এনফোর্সমেন্ট-আইস।
 
বেলেরিম স্কোরোকে তার জন্মভূমিতে ফেরত পাঠানোর জন্য নিউ জার্সির এলিজাবেথ ডিটেনশন সেন্টারে রাখা হয়েছে। স্কোরো প্রায় এক দশক সিআইএ, এফবিআই এবং যুক্তরাষ্ট্রের ড্রাগ এনফোর্সমেন্ট অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের সঙ্গে কাজ করেছেন।
 
গত ৩ আগস্ট নিউ জার্সির একটি ইমিগ্রেশন অফিসে তার কাগজপত্রের মেয়াদ নবায়ন করতে যাওয়ার সময় আইস ৫৫ বছর বয়সী স্কোরোকে গ্রেফতার করে। নিউ জার্সির ইমিগ্রেশন অফিসে গ্রেফতারের সময় স্কোরোর স্ত্রী সুসান তার সঙ্গে ছিলেন।
 
তিনি জানান, ফ্রন্ট ডেস্কে চেক-ইন করার পরপরই আইস কর্মকর্তারা দ্রুত এসে তাকে ধরে ফেলেন। 
 
সুসান বলেন, ‘তারা ওর সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করেছে। ও নিজের পাওনা মিটিয়ে দিয়েছে। ও প্রায় নিজের জীবন হারাতে বসেছিল, অথচ কারো কোনো মাথাব্যথা নেই। ও একটা ক্ষমা পাওয়ার যোগ্য।’ 
 
তিনি আরো যোগ করেন, ‘ওকে নিরাপদে কোনো দেশেই নির্বাসন দেওয়া সম্ভব না। আমাদের সব সময় আতঙ্কে দিন কাটাতে হচ্ছে। স্কোরোর আইনজীবীরা তাকে কসোভোয় ফেরত পাঠানো ঠেকাতে ফেডারেল আদালতে আবেদন করেছেন। তাদের যুক্তি হলো, যুক্তরাষ্ট্রের সংস্থাগুলোর হয়ে কাজ করার কারণে কসোভোয় তার জীবন ঝুঁকির মধ্যে পড়তে পারে; এই বিবেচনায় সরকার এর আগে তাকে নির্বাসন থেকে সুরক্ষা দিয়েছিল।
 
আইনজীবীদের দাবি, যুক্তরাষ্ট্রের আইন প্রয়োগকারী ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর হয়ে কাজ করার বিনিময়ে স্কোরোকে যুক্তরাষ্ট্রে থাকার সুযোগ দেওয়ার ব্যাপারে কার্যত প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল। কসোভোর যুদ্ধ থেকে বাঁচতে ১৯৯৪ সালে স্কোরো পালিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে আসেন এবং রাজনৈতিক আশ্রয়ের আবেদন করেন। 
 
তার ভাষ্যমতে, পরিবারের ভরণপোষণ চালাতে হিমশিম খেয়ে একপর্যায়ে তিনি মাদক পাচারের পথ বেছে নিয়েছিলেন। হেরোইন পাচারের দায়ে ২০০০ সালে গ্রেফতারের পর যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর সঙ্গে তার যোগাযোগ হয়। 
 
স্কোরো জানান, পেনসিলভেনিয়ার একটি ফেডারেল কারাগারে সাজা খাটার সময়, সেখানে কিছু ইসলামপন্থী উগ্রবাদীর সংস্পর্শে আসেন তিনি। এফবিআই-এর নথিতে তাকে একজন ‘গোপন তথ্যদাতা’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। ২০০১ সালে ৯/১১ হামলার পর সিআইএ তার এই যোগাযোগগুলোকে কাজে লাগানোর একটি সুযোগ দেখতে পায়।
 
২০০২ থেকে ২০০৬ সালের মধ্যে এফসিআই অ্যালেনউড কারাগারে বন্দি থাকা অবস্থায় তিনি এফবিআইকে সন্দেহভাজন সন্ত্রাসীদের ব্যাপারে তথ্য দেন। যার মধ্যে ‘লাকাওয়ানা সিক্স’ ভার্জিনিয়ার একটি জিহাদি নেটওয়ার্ক এবং হিজবুল্লাহর সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিরা অন্তর্ভুক্ত ছিল। সিবিএস নিউজের হাতে আসা ২০০৪ সালের এফবিআই-এর অত্যন্ত সংবেদনশীল কিছু নথি থেকে নিশ্চিত হওয়া যায় যে, ওসামা বিন লাদেনের সাথে সংশ্লিষ্ট একটি তদন্তে স্কোরো তথ্যদাতা হিসেবে কাজ করেছিলেন। নথিতে তার দেওয়া কিছু তথ্যকে ‘কার্যকর’ এবং ‘নির্ভরযোগ্য’ হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে।
 
কারাগার থেকে মুক্তি পাওয়ার পরও তার এই কাজ শেষ হয়নি। ২০০৭ সালে কসোভোয় নির্বাসিত হওয়ার পর, সিআইএ তাকে বলকান অঞ্চল থেকে আল কায়েদা সংগঠনে অনুপ্রবেশ করার অনুরোধ জানায়। পূর্বের একটি আইনি ঘোষণা অনুযায়ী, তিনি ছদ্মবেশে বছরের পর বছর ধরে সিরিয়া, লেবানন, জর্ডান, পাকিস্তান এবং মিসরসহ বিভিন্ন দেশে যাতায়াত করেছিলেন। তিনি জানান, ২০০৯ সাল পর্যন্ত তার এই মিশনগুলো চালু ছিল।
 
তার আইনজীবীদের বক্তব্য অনুযায়ী, স্কোরো প্রায় এক দশক ধরে সিআইএ, এফবিআই এবং যুক্তরাষ্ট্রের ড্রাগ এনফোর্সমেন্ট অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের সঙ্গে কাজ করেছেন। তারা স্কোরোর এই সেবাকে ‘যুক্তরাষ্ট্রের আইন প্রয়োগকারী সংস্থার একজন এজেন্ট হিসেবে একনিষ্ঠ ও বীরত্বপূর্ণ কাজ’ হিসেবে অভিহিত করেছেন। স্কোরোর সাবেক আইনজীবী জোশুয়া ড্রাটেল সিবিএস নিউজকে বলেন, তার মক্কেল যুক্তরাষ্ট্রের জন্য অত্যন্ত সাহসিকতা ও দক্ষতার সাথে এক ভয়ঙ্কর অভিজ্ঞতা পার করার পর, গত ১০ বছর ধরে তার পরিবারের সাথে সম্পূর্ণ আইন মেনে এবং একটি ফলপ্রসূ জীবনযাপন করছেন। তিন সন্তানের জনক স্কোরো স্যাটেন আইল্যান্ডে ট্যাক্সি চালাতেন।
 
স্কোরোর ছদ্মবেশ ফাঁস হয়ে যাওয়ায় ২০১৪ সালে তিনি যুক্তরাষ্ট্রে ফিরে আসেন। কসোভোয় তাকে হত্যার এক চেষ্টায় তার পায়ে গুলি করা হয়েছিল। এরপর তিনি কানাডা হয়ে সীমান্ত পার হয়ে পুনরায় যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ করেন। ২০১৬ সালে নিউ ইয়র্ক পুলিশ তাকে তার মেয়ের ছাড়যুক্ত পাবলিক ট্রানজিট কার্ড ব্যবহার করার অপরাধে গ্রেফতার করার পর আইস  তাকে নিজেদের হেফাজতে নেয়। 
 
২০২২ সালের নভেম্বরে একজন ফেডারেল বিচারক রায় দেন যে, নির্যাতন বিরোধী আন্তর্জাতিক চুক্তি-এর অধীনে স্কোরোকে কসোভোয় নির্বাসিত করা যাবে না। কারণ সেখানে গেলে তার ওপর নির্যাতন বা তাকে মেরে ফেলার ঝুঁকি রয়েছে। তবে এই রায়ের মাধ্যমে তিনি স্থায়ীভাবে বসবাসের আইনি অনুমতি পাননি।
 
বর্তমানে তার আইনজীবী রেনে কাঠাওয়ালা এবং অ্যামি গ্রিয়ার যুক্তি দেখাচ্ছেন, ২০২২ সালের ওই সুরক্ষার কারণে আইস চাইলেই একজন বিচারকের পূর্ব অনুমতি ছাড়া তাকে সরাসরি নির্বাসন দিতে পারে না। গত ৩ আগস্ট তার সাম্প্রতিক গ্রেফতারের পরদিন অর্থাৎ ৪ আগস্ট তারা ফেডারেল আদালতে একটি হ্যাবিয়াস কর্পাস রিট পিটিশন দায়ের করেন।
 
নিউ জার্সির এলিজাবেথ ডিটেনশন সেন্টার থেকে স্কোরো সিবিএস নিউজকে বলেন, ‘আমি কখনো ভাবিনি তারা আমার সঙ্গে এভাবে বিশ্বাসঘাতকতা করবে। দয়া করে, আমার যদি মৃত্যুও হয়, তবে যেন এই দেশেই হয় যাতে আমার সন্তানরা আমাকে কবর দিতে পারে।’
 


আপনার মূল্যবান মতামত দিন: