ফাইল ছবি
সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের মধ্যে স্বাক্ষরিত মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তিকে স্বাগত জানিয়েছেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। একই সময়ে ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধে কানাডার অংশগ্রহণের সমালোচনা করেছে তেহরান। অন্যদিকে যুদ্ধবিরতি চললেও দক্ষিণ লেবাননে ইসরাইলি হামলা অব্যাহত থাকায় নতুন করে উত্তেজনা তৈরি হয়েছে।
রোববার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে দেওয়া এক পোস্টে ট্রাম্প বলেন, সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তান শেষ পর্যন্ত মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তিতে স্বাক্ষর করায় তিনি ‘খুবই খুশি’।
ট্রাম্প বলেন, এই চুক্তি দেখিয়ে দিচ্ছে মধ্যপ্রাচ্য কীভাবে ঐক্যবদ্ধ হচ্ছে এবং দেশগুলো কীভাবে আরও কার্যকরভাবে নিজেদের প্রতিরক্ষা নিশ্চিত করতে পারবে।
তিন দেশের নেতৃত্বকে অভিনন্দন জানিয়ে তিনি চুক্তিটিকে ‘বড়, সাহসী ও গুরুত্বপূর্ণ প্রথম পদক্ষেপ’ হিসেবে উল্লেখ করেন।
ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধে কানাডার অংশগ্রহণের তীব্র সমালোচনা করেছে ইরান। দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই রোববার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক বার্তায় কানাডার অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন তোলেন।
তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র কানাডাকে তাদের ‘৫১তম অঙ্গরাজ্য’ বলে অভিহিত করে, কানাডীয় পণ্যে শুল্ক আরোপ করে এবং বিভিন্ন ইস্যুতে কানাডাকে হুমকি দেয়। এরপরও অটোয়া যুক্তরাষ্ট্রকে সন্তুষ্ট করতে ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন যুদ্ধে অংশ নিচ্ছে।
বাঘাই প্রশ্ন করেন, এর বিনিময়ে কানাডা কী পাচ্ছে। তিনি ব্যঙ্গ করে বলেন, ‘এটি কানাডায় হকি নাইট নয়; এটি ওয়াশিংটনের ফার্ম টিম।’
কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি এর আগে মার্চে বলেছিলেন, হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়ার প্রচেষ্টায় সহযোগিতা করতে প্রস্তুত কানাডা। এর মাধ্যমে মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের বৃহত্তর লক্ষ্যগুলোর প্রতি অটোয়ার সমর্থনের ইঙ্গিত পাওয়া যায়।
যুদ্ধবিরতি কার্যকর থাকার পরও দক্ষিণ লেবাননের বিন্ত জবেইল জেলার হাদাথা শহরে রোববার হামলা চালিয়েছে ইসরাইলি সেনাবাহিনী।
লেবাননের সরকারি বার্তা সংস্থার খবরে বলা হয়েছে, ইসরাইলি সেনারা শহরের পশ্চিমাঞ্চলে স্বয়ংক্রিয় অস্ত্র দিয়ে গুলি চালায়। একই সময়ে ইসরাইলি সামরিক যানবাহন শহরের ভেতরেও চলাচল করেছে বলে জানা গেছে।
এর আগে ২ মার্চ লেবাননে ব্যাপক বিমান হামলা শুরু করে ইসরাইল এবং দেশটির দক্ষিণাঞ্চলের কয়েকটি এলাকা দখলে নেয়। লেবানন সরকারের হিসাবে, ওই সময় বাস্তুচ্যুত মানুষের সংখ্যা ১০ লাখ ছাড়িয়ে যায়।
১৭ এপ্রিল কার্যকর হওয়া লেবানন-ইসরাইল যুদ্ধবিরতি পরে কয়েক দফা বাড়ানো হয়। তবে যুদ্ধবিরতি সত্ত্বেও ইসরাইলি বাহিনী ১৫ আগস্ট ভোরেও লেবাননে বিমান হামলা চালায়।
লেবাননের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের হিসাবে, ২ মার্চ থেকে ইসরাইলি হামলায় দেশটিতে ৪ হাজার ৩৪৬ জন নিহত হয়েছেন।
সোমবার ভোরে দক্ষিণ লেবাননের আল-কান্তারা শহরের উপকণ্ঠে ইসরাইলি বিমান হামলার খবর পাওয়া গেছে। একই অঞ্চলের আল-মানসুরি শহরে ইসরাইলি বাহিনী গোলাবর্ষণ করেছে বলে স্থানীয় সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে।
বিন্ত জবেইল জেলার কাফরা শহরে বিস্ফোরকবোঝাই একটি ড্রোন একটি বাড়িতে আঘাত হানলে বাড়িটির একটি অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং দুই বেসামরিক নাগরিক আহত হন। এর আগে শহরটিতে একটি কোয়াডকপ্টার দিয়েও হামলা চালানো হয়েছিল বলে খবর পাওয়া যায়।
এ ছাড়া আলী আল-তাহের পাহাড়, দাওহাত কাফর রুম্মান, দেইর সিরিয়ান এবং আল-কান্তারা এলাকার বিভিন্ন স্থানে ইসরাইলি সামরিক তৎপরতার খবর পাওয়া গেছে। ওয়াদি আল-হুজাইর এলাকায় একটি ইসরাইলি ট্যাংক প্রবেশ করেছে বলেও স্থানীয় সূত্র জানিয়েছে।
কিছু স্থানীয় বাসিন্দার অভিযোগ, ধারাবাহিক হামলার মাধ্যমে তাদের নিজ নিজ এলাকা ছেড়ে যেতে চাপ সৃষ্টি করা হচ্ছে। প্রতিরোধ গোষ্ঠীগুলোর প্রতি সমর্থন রয়েছে—এমন এলাকাগুলোকে শাস্তি দেওয়াও হামলার অন্যতম উদ্দেশ্য বলে তারা মনে করছেন।
শনিবার আনসার শহরে চালানো একটি হামলায় একই পরিবারের সাত সদস্য নিহত ও তিনজন আহত হওয়ার খবরের পর স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে ইসরাইলের সঙ্গে সরাসরি আলোচনা করে শান্তি প্রতিষ্ঠার সরকারি উদ্যোগ নিয়েও সংশয় দেখা দিয়েছে।
এদিকে দক্ষিণ লেবাননে হামলা অব্যাহত রাখার পাশাপাশি কয়েক দিন ধরে চলতে পারে এমন নতুন সংঘাতের প্রস্তুতি নিচ্ছে ইসরাইলি সেনাবাহিনী বলে জানিয়েছে ইসরাইলি সংবাদমাধ্যম।
ইসরাইলের চ্যানেল ১২-এর এক প্রতিবেদনে অজ্ঞাত সামরিক সূত্রের বরাত দিয়ে বলা হয়, লেবাননে কয়েক দিন ধরে যুদ্ধ চলতে পারে—এমন পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে সেনাবাহিনী।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, হিজবুল্লাহর অবকাঠামো লক্ষ্য করে আরও হামলার পরিকল্পনা করছে ইসরাইল। তাদের দাবি, ওই অবকাঠামো ধ্বংস না হওয়া পর্যন্ত অভিযান চালিয়ে যেতে চায় তেলআবিব।
চ্যানেল ১২ আরও দাবি করেছে, দক্ষিণ লেবাননের জাবাল আলী আল-তাহের এলাকায় হিজবুল্লাহর কয়েক ডজন সদস্য ভূগর্ভস্থ অবস্থানে আটকা পড়েছেন। তবে এ দাবির বিস্তারিত কোনো প্রমাণ দেওয়া হয়নি।
ইসরাইলি সংবাদমাধ্যমটির দাবি, সাম্প্রতিক দিনগুলোতে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় লেবানন সরকারের সঙ্গে চলমান আলোচনাকে ক্ষতিগ্রস্ত না করার জন্য ইসরাইল কিছুটা ‘সংযম’ দেখিয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, হিজবুল্লাহর কর্মকাণ্ডের জবাবে সেনাবাহিনী যেসব অভিযান চালানোর প্রস্তাব দিয়েছিল, ইসরাইলি রাজনৈতিক নেতৃত্ব তার কিছু অনুমোদন দেয়নি। আলোচনার প্রক্রিয়া যাতে ব্যাহত না হয়, সে কারণেই এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
তবে লেবানন সীমান্তে সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে উত্তেজনা বাড়ছে। যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় ইসরাইল ও লেবাননের মধ্যে সমঝোতার চেষ্টা চললেও দক্ষিণ লেবাননে ইসরাইলি সামরিক অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
লেবাননের কর্তৃপক্ষের হিসাবে, ২ মার্চ থেকে চলা ইসরাইলি সামরিক অভিযানে এখন পর্যন্ত ৪ হাজার ৩৪৬ জন নিহত, ১২ হাজার ৩০১ জন আহত এবং ১০ লাখের বেশি মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন।
ইসরাইল দক্ষিণ লেবাননের বিভিন্ন এলাকাও দখলে রেখেছে। কিছু এলাকা কয়েক দশক ধরে এবং কিছু ২০২৩-২৪ সালের যুদ্ধের পর থেকে ইসরাইলের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। বর্তমান অভিযানে ইসরাইলি বাহিনী লেবাননের ভূখণ্ডের ১০ কিলোমিটারেরও বেশি ভেতরে অগ্রসর হয়েছে বলে লেবাননের বিভিন্ন সূত্র জানিয়েছে।
আপনার মূল্যবান মতামত দিন: