ছবি: গ্রাফিক্স
শিশু-কিশোরদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আসক্ত করে তোলার অভিযোগে যুক্তরাষ্ট্রে নতুন করে আইনি চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে ফেসবুক ও ইনস্টাগ্রামের মালিক প্রতিষ্ঠান মেটা। চলতি সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল আদালতে শুরু হচ্ছে মামলার গুরুত্বপূর্ণ শুনানি। বিশেষজ্ঞরা ঘটনাটিকে ১৯৯০-এর দশকে তামাক কোম্পানিগুলোর বিরুদ্ধে পরিচালিত আইনি লড়াইয়ের সঙ্গে তুলনা করছেন। তাঁদের ভাষায়, এটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ‘বিগ টোব্যাকো মোমেন্ট’ বা ‘বড় তামাক মুহূর্ত’ হয়ে উঠতে পারে।
২০২৩ সালে যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যের একটি জোট মেটার বিরুদ্ধে মামলা করে। অভিযোগ ছিল, শিশু-কিশোরদের লক্ষ্য করে ফেসবুক ও ইনস্টাগ্রামে এমন কিছু ফিচার তৈরি করা হয়েছে, যা ব্যবহারকারীদের দীর্ঘ সময় প্ল্যাটফর্মে আটকে রাখে এবং আসক্তি তৈরি করে। পরে যুক্তরাষ্ট্রের ২৯ অঙ্গরাজ্যের সেই মামলায় দাবিগুলো উপস্থাপনের জন্য ক্যালিফোর্নিয়া, কলোরাডো, কেনটাকি ও নিউ জার্সি—এই চারটি অঙ্গরাজ্যকে বেছে নেওয়া হয়।
রাষ্ট্রপক্ষের শীর্ষ আইন কর্মকর্তারা আদালতে প্রমাণ করতে চান, শিশুদের জন্য ক্ষতিকর হওয়ার বিষয়টি জেনেও মেটা ইচ্ছাকৃতভাবে তাদের প্ল্যাটফর্মের এমন নকশা করেছে, যাতে তরুণ ব্যবহারকারীরা বারবার ফিরে আসে।
তবে অভিযোগ জোরালোভাবে প্রত্যাখ্যান করেছে মেটা। প্রতিষ্ঠানটির এক মুখপাত্র বলেছেন, তরুণদের সহায়তায় তাদের দীর্ঘদিনের কর্মকাণ্ডের প্রমাণই আদালতে উঠে আসবে। অভিভাবক, বিশেষজ্ঞ ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে কাজ করে তরুণদের অনলাইনে সুরক্ষিত রাখতে চেষ্টা করেছে বলেও দাবি করেছে প্রতিষ্ঠানটি।
বার্কলের লাইফ সায়েন্সেস ল অ্যান্ড পলিসি সেন্টারের পরিচালক ভিনসেন্ট জোরালেমন বলেন, মামলাটির সঙ্গে ১৯৯০-এর দশকে তামাক শিল্পের বিরুদ্ধে সরকারের আইনি লড়াইয়ের গুরুত্বপূর্ণ মিল রয়েছে। সে সময় দীর্ঘ গবেষণায় তামাকের স্বাস্থ্যঝুঁকি প্রমাণিত হওয়ার পরও কোম্পানিগুলো ক্ষতিকর প্রভাবকে ছোট করে দেখানো বা গোপন করার চেষ্টা করেছিল বলে অভিযোগ ওঠে।
১৯৯৮ সালে যুক্তরাষ্ট্রের ৪৬টি অঙ্গরাজ্য চারটি বড় তামাক কোম্পানির সঙ্গে ঐতিহাসিক সমঝোতায় পৌঁছায়। এতে বিপুল আর্থিক জরিমানা এবং শিশুদের লক্ষ্য করে তামাকজাত পণ্যের বিপণনে বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়।
অকল্যান্ডে শুরু হতে যাওয়া মেটার মামলায় আর্থিক জরিমানার পাশাপাশি ফেসবুক ও ইনস্টাগ্রামের কার্যক্রমে বড় ধরনের পরিবর্তন আনার দাবি জানিয়েছে অঙ্গরাজ্যগুলো। মামলায় মেটার প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী মার্ক জাকারবার্গসহ গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের সাক্ষ্য দেওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন অধ্যাপক নোরা ফ্রিম্যান এনগস্ট্রমের মতে, এই মামলা মেটার বিরুদ্ধে আরও বিস্তৃত আইনি ও সামাজিক জবাবদিহির সূচনা করতে পারে। বিশেষ করে প্রতিষ্ঠানটি অভ্যন্তরীণভাবে কী জানত এবং জনসমক্ষে কী তথ্য প্রকাশ করেছিল—এই ব্যবধানটি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
এদিকে মেটার বিরুদ্ধে পৃথক কয়েকটি মামলায় ইতিমধ্যে রায় হয়েছে। মে মাসে স্ন্যাপ, টিকটক, ইউটিউব ও মেটা কেনটাকির একটি স্কুল কর্তৃপক্ষের সঙ্গে ২ কোটি ৭০ লাখ ডলারের সমঝোতা করে। একই সময়ে আপিল আদালত মেটা, গুগল, স্ন্যাপ ও টিকটকের বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া আরও ৩ হাজারের বেশি মামলা এগিয়ে নেওয়ার অনুমতি দিয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের ধারণা, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের শিশুদের ওপর প্রভাব নিয়ে এই আইনি লড়াই বহু বছর ধরে চলতে পারে। মামলাটির ফল শুধু মেটার আর্থিক ক্ষতি নয়, প্রতিষ্ঠানটির সুনাম এবং ফেসবুক-ইনস্টাগ্রামের ভবিষ্যৎ নকশাতেও বড় পরিবর্তন আনতে পারে।
আপনার মূল্যবান মতামত দিন: