ফাইল ছবি
আমেরিকান সামরিক বাহিনীর সাইবার কমান্ডের কর্মীদের মধ্যে হঠাৎ করেই অস্বাভাবিক হারে বেড়ে গেছে আত্মহত্যার ঘটনা।
গ্রীষ্মের মাত্র এক মাসের ব্যবধানে বেশ কয়েকজন কর্মীর এমন মৃত্যুর পর পুরো বিষয়টি এখন গভীরভাবে খতিয়ে দেখছে দপ্তরটি। জানা গেছে, গত জুন থেকে জুলাইয়ের শুরুর দিকে আমেরিকান-ইরান সংঘাতের পারদ যখন সবচেয়ে ওপরে ছিল, ঠিক তখনই একের পর এক আত্মহত্যার ঘটনাগুলো ঘটে।
ব্লুমবার্গের এক প্রতিবেদনে শনিবার এই চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে।
প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, গত জুন মাসের শুরু থেকে জুলাইয়ের প্রথম সপ্তাহের মধ্যে সাইবার কমান্ডে কর্মরত বা এর সাথে নিবিড়ভাবে যুক্ত অন্তত পাঁচজন কর্মী আত্মহত্যা করেছেন। সামরিক বাহিনীর ভেতরের খবরাখবর, সরকারি নথিপত্র এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সাথে কথা বলে ব্লুমবার্গ এই তথ্য নিশ্চিত করেছে।
পরপর এসব মৃত্যুর ঘটনাকে 'সুইসাইড ক্লাস্টার' বা 'গুচ্ছআত্মহত্যা' হিসেবে চিহ্নিত করেছে সাইবার কমান্ড। পেন্টাগন বা আমেরিকান প্রতিরক্ষা দপ্তরের পরিভাষায়, স্বাভাবিক সময়ের চেয়ে খুব কম ব্যবধানে পরপর একাধিক আত্মহত্যার ঘটনা ঘটলে তাকে 'সুইসাইড ক্লাস্টার' বলা হয়। এই ধরনের পরিস্থিতিতে জরুরি ভিত্তিতে বিশেষ পদক্ষেপ নেয়া বাধ্যতামূলক হয়ে পড়ে।
আমেরিকান সাইবার কমান্ডের সামরিক হ্যাকার বা অপারেটরদের মূল কাজ হলো দেশের সামরিক বাহিনীর কম্পিউটার নেটওয়ার্ক নিরাপদ রাখা। এর পাশাপাশি শত্রুপক্ষের যোগাযোগ ব্যবস্থা, আকাশ প্রতিরক্ষা নেটওয়ার্ক এবং রণক্ষেত্রের অন্যান্য সামরিক সক্ষমতা পঙ্গু করে দিতে তারা বিদেশী সামরিক কম্পিউটার সিস্টেমে ঢোকে, হামলা করে বা হ্যাকিং চালিয়ে থাকে। অত্যন্ত সুরক্ষিত ও গোপনীয় স্থানে বা 'হাইলি সিকিউরড ফ্যাসিলিটি'-তে বসে তারা এই কাজ করেন, যার বড় অংশই অত্যন্ত গোপন বা 'ক্লাসিফাইড'।
এ ধরনের কাজের মানসিক চাপ যে চরম পর্যায়ের, তা নিয়ে আমেরিকান সামরিক কর্তাদের উদ্বেগ নতুন কিছু নয়। ব্লুমবার্গের বরাতে জানা গেছে, আমেরিকান সেনাবাহিনীর অর্থায়নে পরিচালিত একটি গবেষণায় দেখা গেছে—এই সাইবার অপারেটররা প্রায়শই তীব্র অনিদ্রা, স্মৃতিভ্রম বা স্মৃতিশক্তি হ্রাস, একই দুশ্চিন্তা বারবার মাথায় ঘোরা বা 'রুমিনেশন'সহ নানা শারীরিক রোগভোগের শিকার হয়ে থাকেন।
সামরিক হ্যাকারদের মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে আমেরিকান পার্লামেন্ট অর্থাৎ কংগ্রেসে আগেও আলোচনা হয়েছে। ২০২৫ সালের একটি প্রতিরক্ষা আইনের মাধ্যমে সাইবার কমান্ডের জন্য বিশেষ মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ নিয়োগের বাধ্যতামূলক করা হয়েছিল। এর মধ্যে গোপনীয় বা 'ক্লাসিফাইড' তথ্য নিয়ে কাজ করা কর্মীদের পরামর্শ দেয়ার মতো নিরাপত্তা ছাড়পত্র বা 'ক্লিয়ারেন্স রয়েছে এমন কাউন্সিলরদের যুক্ত করার নির্দেশ ছিল।
তবে সাম্প্রতিক একের পর এক আত্মহত্যার ঘটনা সামনে আসার পর বিষয়টি নিয়ে কংগ্রেসে আবারো নতুন করে তদারকি শুরু হয়েছে। ব্লুমবার্গের তথ্যমতে, আমেরিকান আইনসভার উচ্চকক্ষ ‘সিনেট আর্মড সার্ভিসেস কমিটি’ সাইবার কমান্ডকে আরো বাড়তি মানসিক সহায়তা বা রিসোর্স দেয়ার বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করছে। অন্যদিকে নিম্নকক্ষ ‘হাউস কমিটি’ আত্মহত্যার এই বৃদ্ধিকে একটি 'সংকটজনক বিষয়' হিসেবে অভিহিত করেছে।
ব্লুমবার্গের বিভিন্ন সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, বিদেশী সংঘাত—বিশেষ করে ইরান যুদ্ধের কারণে সাইবার হ্যাকারদের কাজের চাপ একলাফে বহুগুণ বেড়ে গেছে। গত জুন থেকে জুলাইয়ের শুরুর দিকে এই যুদ্ধের সবচেয়ে উত্তপ্ত পর্বটি চলছিল, আর ঠিক তখনই এসব আত্মহত্যার ঘটনা ঘটে।
ওই সময়ে আমেরিকান ও ইরানি বাহিনী একে অপরের ওপর বেশ কয়েক দফায় হামলা চালায়। আমেরিকান সেন্ট্রাল কমান্ড লক্ষ্যবস্তু বানায় ইরানের সামরিক নজরদারি ও যোগাযোগ অবকাঠামোকে। জবাবে পাল্টা আঘাত হিসেবে কুয়েত ও বাহরাইনে অবস্থিত আমেরিকান সামরিক ঘাঁটিগুলোতে হামলা চালায় তেহরান।
শুধু যুদ্ধই নয়, দিন দিন শক্তিশালী হয়ে ওঠা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই মডেলের দৌড়ঝাঁপও হ্যাকারদের কাজের চাপ বাড়িয়ে দিয়েছে। একদিকে উন্নত এআই প্রয়োগ করা, অন্যদিকে শত্রুপক্ষের এআই মোকাবিলা করা—এই দুইমুখী লড়াইয়ে নামতে হয়েছে তাদের।
নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, আধুনিকতম এআই প্রযুক্তি এখন খুব সহজেই সফটওয়্যারের নানা ত্রুটি বা দুর্বলতা খুঁজে বের করতে পারে এবং জটিল সব সাইবার হামলা চালাতে সাহায্য করে। ফলে নতুন এই প্রযুক্তির সাথে খাপ খাইয়ে প্রতিরক্ষা বুহ্য সাজাতে মার্কিন সামরিক বাহিনী ও সরকারকে প্রতিনিয়ত বাড়তি ঘাম ঝরাতে হচ্ছে।
আপনার মূল্যবান মতামত দিন: