ছবি: গ্রাফিক্স
আধুনিক গাড়ি এখন আর শুধু চলাচলের মাধ্যম নয়, চালকের ব্যক্তিগত তথ্য সংগ্রহের বড় উৎসেও পরিণত হয়েছে। আপনি কোথায় যাচ্ছেন, কিভাবে গাড়ি চালাচ্ছেন, এমনকি মুখভঙ্গি কেমন তাও সংগ্রহ করছে গাড়ি নির্মাতা প্রতিষ্ঠানগুলো।
বিশেষজ্ঞদের মতে, আধুনিক গাড়ি এখন কার্যত ‘চাকার ওপর কম্পিউটার’। ইন্টারনেট-সংযুক্ত এসব গাড়ি চালকের অবস্থান, গতি, ব্রেকের ব্যবহার, সিটবেল্ট বাঁধা হয়েছে কি না এমন অসংখ্য তথ্য নিয়মিত সংগ্রহ করছে।
কিছু গাড়ি চালকের ওজন, বয়স, জাতিগত পরিচয় ও মুখের অভিব্যক্তির মতো তথ্যও সংগ্রহ করতে পারে। এমনকি গাড়ির ভেতরের ক্যামেরার মাধ্যমে চালকের আচরণও পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান ব্রুকিংস ইনস্টিটিউশনের প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ ড্যারেল ওয়েস্ট বলেন, ‘মানুষ জানতে পারলে বিস্মিত হবে, তাদের গাড়ি কত ধরনের তথ্য সংগ্রহ করছে। এসব তথ্য দিয়ে কারো জীবন প্রায় প্রতি সেকেন্ড ধরে পুনর্গঠন করা সম্ভব।’
বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, নতুন আইন কার্যকর হলে পরিস্থিতি আরো জটিল হতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রে শিগগিরই নতুন গাড়িতে ইনফ্রারেড বায়োমেট্রিক ক্যামেরা ও আচরণ বিশ্লেষণ প্রযুক্তি বাধ্যতামূলক হতে যাচ্ছে।
এর মাধ্যমে চালক মাতাল, ক্লান্ত বা গাড়ি চালানোর অনুপযুক্ত কি না, তা শনাক্ত করা হবে।
তবে গোপনীয়তা বিশেষজ্ঞদের প্রশ্ন, এই প্রযুক্তি যে বিপুল পরিমাণ স্বাস্থ্য ও আচরণসংক্রান্ত তথ্য সংগ্রহ করবে, সেগুলোর ব্যবহার নিয়ন্ত্রণে এখনো কোনো স্পষ্ট নিয়ম নেই।
মোজিলা ফাউন্ডেশন ২০২৩ সালে ২৫টি গাড়ি ব্র্যান্ডের গোপনীয়তা নীতি বিশ্লেষণ করে। প্রতিবেদনে বলা হয়, গোপনীয়তা রক্ষার ক্ষেত্রে কোনো ব্র্যান্ডই তাদের নির্ধারিত মান পূরণ করতে পারেনি।
মোজিলার ভাষায়, ‘গোপনীয়তার দিক থেকে গাড়ি সবচেয়ে খারাপ পণ্যে পরিণত হয়েছে।’
প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিভিন্ন গাড়ি কম্পানি ব্যবহারকারীর নাম, বয়স, আর্থিক তথ্য, ওজন, মানসিক প্রবণতা, মুখের অভিব্যক্তি—এমনকি যৌন জীবন ও স্বাস্থ্যসংক্রান্ত তথ্য সংগ্রহের অধিকারও নিজেদের নীতিতে উল্লেখ করেছে।
তবে কিয়া মোটরস দাবি করেছে, তারা বাস্তবে গ্রাহকের যৌন জীবন বা স্বাস্থ্য তথ্য সংগ্রহ করে না। এসব তথ্য কেবল ক্যালিফোর্নিয়ার ‘সংবেদনশীল তথ্য’ সংজ্ঞার অংশ হিসেবে নীতিমালায় উল্লেখ করা হয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গাড়ির ভেতরে থাকা অসংখ্য সেন্সরই এই তথ্য সংগ্রহের মূল মাধ্যম। সিট, স্টিয়ারিং, ড্যাশবোর্ড, ইঞ্জিন ও ক্যামেরার মাধ্যমে গাড়ি চালকের প্রায় সব আচরণ পর্যবেক্ষণ করতে পারে।
মোজিলার প্রতিবেদনে আরো বলা হয়, ২৫টির মধ্যে ১৯টি গাড়ি কম্পানি ব্যবহারকারীর তথ্য বিক্রির অধিকার নিজেদের নীতিতে রেখেছে।
যুক্তরাষ্ট্রে জেনারেল মোটরসের বিরুদ্ধে চালকদের অবস্থানসংক্রান্ত তথ্য অনুমতি ছাড়া বিক্রির অভিযোগও উঠেছে। ওই তথ্য পরে বীমা প্রতিষ্ঠানগুলো ব্যবহার করেছে বলে জানা গেছে।
একজন চালক নিউইয়র্ক টাইমসকে জানান, তার ও তার স্ত্রীর ছয় মাসের যাতায়াতের ১৩০ পৃষ্ঠার তথ্য সংরক্ষণ করেছিল তথ্য ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠান লেক্সিসনেক্সিস। পরে তার গাড়ির বীমা খরচ ২১ শতাংশ বেড়ে যায়।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গাড়ি কম্পানি, তথ্য ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠান ও বীমা কম্পানির মধ্যে এখন বড় ধরনের তথ্য বাণিজ্য গড়ে উঠেছে।
কনজ্যুমার ফেডারেশন অব আমেরিকার গবেষক মাইকেল ডিলং বলেন, ‘বীমা কোম্পানিগুলো বিপুল পরিমাণ চালকসংক্রান্ত তথ্য ব্যবহার করে বেশি প্রিমিয়াম নেওয়া বা গ্রাহকদের বিভিন্ন শ্রেণিতে ভাগ করছে।’
অবশ্য গাড়ি নির্মাতাদের দাবি, তারা ব্যবহারকারীর অনুমতি নিয়েই তথ্য সংগ্রহ করে। তবে সেই অনুমতি সাধারণত দীর্ঘ ও জটিল গোপনীয়তা নীতিতে লুকানো থাকে, যা অধিকাংশ মানুষ পড়েন না।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পুরো সমস্যা এড়ানো কঠিন হলেও কিছু পদক্ষেপ নেওয়া যেতে পারে।
যেমন, বীমা প্রতিষ্ঠানের ‘টেলিমেটিক্স’ প্রোগ্রামে না যুক্ত হওয়া, গাড়ির গোপনীয়তা সেটিংস পরিবর্তন করা এবং তথ্য সংগ্রহ বন্ধ বা মুছে ফেলার আবেদন করা।
তবে মোজিলার গবেষক জেন ক্যালট্রাইডারের মতে, ‘ব্যবহারকারীদের এত কিছু করতে বাধ্য হওয়া উচিত নয়। যত দিন মানুষ নিজেদের তথ্যের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ না পাবে, তত দিন এই সমস্যা আরো বাড়তেই থাকবে।’
এই বিভাগের অন্যান্য খবর
আপনার মূল্যবান মতামত দিন: