ইরান ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক তৎপরতায় যুদ্ধের শঙ্কা

মুনা নিউজ ডেস্ক | ২৯ জানুয়ারী ২০২৬ ১৯:১২

ছবি : সংগৃহীত ছবি : সংগৃহীত

ইরানের উপকূলে আমেরিকান সামরিক শক্তির অভাবনীয় সমাবেশ আর হোয়াইট হাউসের কঠোর হুঁশিয়ারি, দুই মিলিয়ে মধ্যপ্রাচ্যের রাজনৈতিক মানচিত্র এখন চরম উত্তেজনার মুখে দাঁড়িয়ে। গত কয়েক দিনে আরব সাগরে যুক্তরাষ্ট্রের পারমাণবিক শক্তিচালিত বিমানবাহী রণতরী ইউএসএস আব্রাহাম লিংকনের উপস্থিতি এবং সেই সঙ্গে বিশেষ মহড়া বিশ্বজুড়ে নতুন আশঙ্কার জন্ম দিয়েছে। আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা প্রশ্ন তুলছেন, এই সামরিক প্রস্তুতি কি কেবলই শক্তি প্রদর্শন নাকি ২০২৫ সালের জুনে হওয়া ‘অপারেশন মিডনাইট হ্যামার’-এর চেয়েও ভয়াবহ কোনো হামলার পূর্বাভাস?

ঘটনার সূত্রপাত গত ডিসেম্বরের শেষ দিকে। মুদ্রাস্ফীতি আর অর্থনৈতিক সংকটের জেরে ইরানে গণবিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। এটিই পরবর্তীতে সরকার পতনের আন্দোলনে রূপ নেয়। মানবাধিকার সংস্থাগুলোর দাবি অনুযায়ী, এই বিক্ষোভে কয়েক হাজার মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন। বিক্ষোভকারীদের ওপর এই দমন-পীড়নের ঘটনায় ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া দেখান প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তিনি সরাসরি বিক্ষোভকারীদের উদ্দেশে বার্তা দেন যে ‘সাহায্য আসছে’ এবং ইরান যদি কারাবন্দীদের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করে, তবে দেশটিকে চড়া মূল্য দিতে হবে। যদিও ইরান সরকার পরবর্তীতে কোনো ফাঁসি কার্যকর না করার আশ্বাস দেয়, তবুও ওয়াশিংটনের সামরিক তৎপরতা কমার কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না।

গত সোমবার ইউএসএস আব্রাহাম লিংকন দক্ষিণ চীন সাগর থেকে গতিপথ বদলে আরব সাগরে প্রবেশ করে। তারপর থেকেই উত্তেজনার পারদ চড়তে শুরু করে। কারণ, এটি কেবল যুদ্ধজাহাজ নয় বরং ভ্রাম্যমাণ বিমান ঘাঁটি। এই রণতরীর সঙ্গে রয়েছে তিনটি অত্যাধুনিক ডেস্ট্রয়ার, ইউএসএস ফ্রাঙ্ক ই পিটারসেন জুনিয়র, ইউএসএস স্প্রুয়েন্স এবং ইউএসএস মাইকেল মারফি। প্রতিটি জাহাজই টমাহক মিসাইল এবং উন্নত রাডার সিস্টেমে সজ্জিত। এছাড়া ইউএস এয়ার ফোর্স সেন্ট্রাল কমান্ড (এসেন্ট) পুরো মধ্যপ্রাচ্য জুড়ে বিশাল সামরিক মহড়া শুরু করেছে। যার লক্ষ্য হচ্ছে ‘যেকোনো পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুত থাকা’।

২০২৫ সালের জুন মাসের সেই রাতের কথা মনে করলে এই আশঙ্কার গভীরতা বোঝা যায়। ‘অপারেশন মিডনাইট হ্যামার’ নামের সেই অভিযানে ১২৫টি মার্কিন যুদ্ধবিমান এবং সাবমেরিন থেকে ছোড়া মিসাইলে ইরানের তিনটি প্রধান পারমাণবিক কেন্দ্র ফোরদো, নাতাঞ্জ এবং ইসফাহান লন্ডভন্ড হয়ে গিয়েছিল। সেই অভিযানে ব্যবহৃত হয়েছিল শক্তিশালী ‘বাঙ্কার বাস্টার’ বোমা। এটি মাটির প্রায় ২০০ ফুট গভীর পর্যন্ত আঘাত করতে সক্ষম। কিন্তু এবারের পরিস্থিতি ভিন্ন। বিশ্লেষকদের মতে, এবার যদি হামলা হয় তবে মার্কিন লক্ষ্যবস্তু সম্ভবত পারমাণবিক কেন্দ্রের বদলে সরাসরি ইরানের শাসন ব্যবস্থার ভিত্তি বা রাজনৈতিক নেতৃত্বের ওপর হতে পারে।

প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এয়ার ফোর্স ওয়ানে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে গত সপ্তাহে বলেছেন, এই বিশাল নৌবহর পাঠানো হয়েছে ‘প্রয়োজন পড়লে ব্যবহারের জন্য’। তিনি প্রচ্ছন্ন হুমকি দিয়ে বলেছেন, এবার যদি যুক্তরাষ্ট্রকে ব্যবস্থা নিতে হয়, তবে তা গত বছরের জুনের হামলাকে নিতান্তই নগণ্য বা ‘পিনাটস’ প্রমাণ করবে। এই মন্তব্য এবং সামরিক কৌশলগত অবস্থান ইঙ্গিত দিচ্ছে, ওয়াশিংটন এবার সম্ভবত কোনো সীমাবদ্ধ লক্ষ্যবস্তুর বদলে বড় ধরনের পরিবর্তনের দিকে নজর দিচ্ছে।

তবে এ ধরনের হামলার ঝুঁকিও অনেক। ইউরোপীয় কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশনসের বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এবার যদি যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি সরকার পরিবর্তনের লক্ষ্য নিয়ে হামলা চালায়, তবে তেহরান সম্ভবত হাত গুটিয়ে বসে থাকবে না। তারা পাল্টা ব্যবস্থা হিসেবে মধ্যপ্রাচ্যে মোতায়েন মার্কিন সেনাদের ওপর আক্রমণ করতে পারে কিংবা হরমুজ প্রণালীর মতো গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক জলপথ বন্ধ করে দিয়ে বিশ্ব অর্থনীতিতে বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে। এছাড়া গত বছরের জুনের হামলার পর ইরান যেভাবে কাতারে যুক্তরাষ্ট্রের বিমান ঘাঁটিতে সীমিত পাল্টা হামলা চালিয়েছিল, এবারের প্রতিক্রিয়া তার চেয়ে অনেক বেশি ধ্বংসাত্মক হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

আবার অনেক বিশ্লেষক মনে করছেন, ইরান এখন আগের চেয়েও বেশি দুর্বল। দেশটিতে চলমান ইন্টারনেট ব্ল্যাকআউট এবং অর্থনৈতিক ধস সরকারকে অনেকটা কোণঠাসা করে ফেলেছে। এই সুযোগটিই হয়তো ওয়াশিংটন কাজে লাগাতে চাইছে। তবে শেষ পর্যন্ত কূটনীতি নাকি কামানের গর্জন, কোনটি জয়ী হবে, তা নির্ভর করছে আগামী কয়েক দিনের গতিপ্রকৃতির ওপর। এই মুহূর্তে আরব সাগরের শান্ত জল যেন এক বিশাল ঝড়ের অপেক্ষায় স্তব্ধ হয়ে আছে।



আপনার মূল্যবান মতামত দিন: