ফাইল ছবি
ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর সরকারি বাসভবনের কাছে অবস্থিত দিল্লির শতবর্ষী রেসকোর্স মসজিদে প্রশাসনিক নিষেধাজ্ঞা, পানি ও বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন এবং জমি খালি করার নোটিশ সত্ত্বেও মুসল্লিরা প্রবেশ করে নামাজ আদায় করেছেন।
ল্যান্ড অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট অফিস (এলঅ্যান্ডডিও) জমিটিকে ‘অননুমোদিত’ বা বেআইনি দখল দাবি করে মসজিদের ইমামকে ছয় দিনের মধ্যে প্রাঙ্গণ খালি করার নির্দেশ দিয়েছিল। গত ৭ অক্টোবর মসজিদটির পানি ও বিদ্যুৎ সংযোগ কেটে দেওয়া হয় এবং মূল ফটক বন্ধ করে মুসল্লিদের প্রবেশে বাধা তৈরি করা হয়।
তবে সমস্ত বিধিনিষেধ ভেঙে মঙ্গলবার প্রায় ১০ জন মুসল্লি প্রাঙ্গণে প্রবেশ করেন এবং জোহরের নামাজ আদায় করেন। শুরুতে নিরাপত্তাকর্মীরা উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের নির্দেশের দোহাই দিয়ে তাদের বাধা দেওয়ার চেষ্টা করলেও শেষ পর্যন্ত তারা ভেতরে ঢুকতে সক্ষম হন।
ঘটনাস্থলে টাঙানো এলঅ্যান্ডডিও-র একটি সতর্কীকরণ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, ‘‘এই জমির মালিক ভারত সরকার। এখানে যেকোনো অননুমোদিত দখল, নির্মাণ বা অবৈধ কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে।’’ বিজ্ঞপ্তিতে বাস্তবায়নকারী সংস্থা হিসেবে সেন্ট্রাল পাবলিক ওয়ার্কস ডিপার্টমেন্ট (সিপিডব্লিউডি)-এর নাম উল্লেখ করা হয়েছে।
মসজিদে প্রবেশ করতে চাওয়া আফজাল খান নামে এক মুসল্লি ক্ষোভ প্রকাশ করে অভিযোগ করেন, মুসলিমদের ধর্মপালনে বাধা দেওয়া হচ্ছে। তিনি বলেন, "এখানে একচ্ছত্র স্বৈরাচার চলছে। দেশজুড়ে কোথাও মুক্তভাবে এবাদত করার পরিবেশ নেই। তারা চায় না আমরা আমাদের ধর্ম পালন করি।"
তিনি আরও অভিযোগ করেন, বিচার বিভাগ চাপের মুখে কাজ করছে এবং ওয়াকফ বোর্ডের নেতৃত্ব ‘সরকারের দাসে’ পরিণত হয়েছে।অন্য এক মুসল্লি ভারতে মুসলিমদের ক্রমবর্ধমান অসহায়ত্ব ও অবমাননার কথা উল্লেখ করে গভীর হতাশা প্রকাশ করেন।
সোশ্যাল ডেমোক্রেটিক পার্টি অব ইন্ডিয়া (এসডিপিআই)-এর ড. আবু ওবাইদ অনেক কষ্টে ভেতরে ঢুকে নামাজ আদায় করেন। তিনি এই বিধিনিষেধকে ফিলিস্তিনে ইসরায়েলি বাহিনীর উপাসনালয়ে প্রবেশের ওপর নিষেধাজ্ঞার সাথে তুলনা করেছেন।
দিল্লি প্রশাসনের ১৯৭৭ সালের ৮ সেপ্টেম্বরের অফিশিয়াল গ্যাজেট নোটিফিকেশনের ১৮ নম্বর ক্রমিকে সাফদারজং মাকবারার পেছনে অবস্থিত এই মসজিদ ও সংলগ্ন কবরস্থানের কথা স্পষ্ট উল্লেখ রয়েছে। দুই বিঘা জমির ওপর প্রতিষ্ঠিত এই প্রাঙ্গণটি একটি স্বীকৃত ওয়াকফ সম্পত্তি। এছাড়া নিউ দিল্লি মিউনিসিপ্যাল কাউন্সিল (এনডিএমসি)-এর ঐতিহ্যবাহী স্থান বা ‘হেরিটেজ’ তালিকার অন্তর্ভুক্ত এটি।
মসজিদের ইমাম মোহাম্মদ হারুন এক ভিডিও বার্তায় জানান, তিনি গত ছয় মাস ধরে দিল্লি ওয়াকফ বোর্ডের কাছে বিষয়টি নিয়ে বারবার ধরনা দিলেও কোনো সাহায্য পাননি। তিনি বলেন, "আমি বোর্ডের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তার (সিইও) কাছে অনেক অনুরোধ করেছি, কিন্তু কেউ কান দেয়নি। মসজিদের পথ বন্ধ করে দেওয়ায় পানি আনারও সুযোগ নেই, খাবার পানিটুকু পর্যন্ত শেষ হয়ে গেছে।"
ইমাম হারুন জানান, ২০২১ সালের সরকারি জরিপেই স্পষ্ট করা হয়েছিল যে এই মসজিদটি কোনো অবৈধ দখল বা অননুমোদিত সম্পত্তি নয়। ওয়াকফ বোর্ডকে আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েও সাড়া না পেয়ে তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করেন।
পরবর্তীতে ব্যাপক সমালোচনার মুখে গত সোমবার দিল্লি ওয়াকফ বোর্ড ল্যান্ড অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট অফিসের কাছে চিঠি পাঠায়। চিঠিতে ৭ অক্টোবর হঠাৎ করে পানি ও বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করার প্রতিবাদ জানানো হয় এবং বলা হয় যে ১৯৭৬ সাল থেকে মসজিদটিতে বৈধ বিদ্যুৎ সংযোগ রয়েছে। ওয়াকফ বোর্ড অবিলম্বে বিদ্যুৎ ও পানি সরবরাহ পুনর্বহাল করার দাবি জানিয়েছে।
এ বিষয়ে ইমাম হারুন আশা প্রকাশ করে বলেন, "আমি একজন সাধারণ ইমাম, ওয়াকফ বোর্ডই আইনি কর্তৃপক্ষ। যা করার তারাই করবে।" বিদ্যুৎ না থাকায় ইমামের পরিবার বর্তমানে জেনারেটর চালিয়ে দিন কাটাচ্ছে।
নিষেধাজ্ঞার এই পদক্ষেপকে ‘সম্পূর্ণ বেআইনি ও স্বেচ্ছাচারী’ বলে আখ্যা দিয়েছেন এআইএমআইএম নেতা শোয়েব জামাই। তিনি বলেন, "১৯৭৭ সালের গ্যাজেট নোটিফিকেশনই প্রমাণ করে যে এটি ১০০ বছরেরও বেশি পুরনো একটি বৈধ মসজিদ। মৌখিক হুমকিতে কাজ চালানো অরাজকতার সামিল।" তিনি আরও অভিযোগ করেন, কর্তৃপক্ষ দিল্লি পুলিশ ও নগর নিগমের মাধ্যমে দিল্লিতেও "যোগী মডেল" চালু করার ষড়যন্ত্র করছে।রাজনৈতিক খবর পড়ুন
সোমবার অল ইন্ডিয়া জমিয়তে উলামায়ে হিন্দের একটি প্রতিনিধি দল কেন্দ্রীয় সংখ্যালঘু বিষয়ক মন্ত্রী কিৰেন রিজিজুর সাথে দেখা করে স্মারকলিপি জমা দেয়। জমিয়তের সাধারণ সম্পাদক মাওলানা মুহাম্মদ হাকিমুদ্দিন কাসমির নেতৃত্বে প্রতিনিধি দলটি মন্ত্রীকে মসজিদের আইনি মর্যাদা বজায় রাখা এবং বিদ্যুৎ-পানি সংযোগ অবিলম্বে ফিরিয়ে দেওয়ার দাবি জানায়। মন্ত্রী বিষয়টি খতিয়ে দেখার আশ্বাস দিয়েছেন।
এআইএমআইএম প্রধান আসাদউদ্দিন ওয়াইসি দিল্লি ওয়াকফ বোর্ডের ভূমিকায় তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ২০২৩ সাল থেকে স্থায়ী দিল্লি ওয়াকফ বোর্ড না থাকায় প্রশাসনিক স্তরে অচলবস্থা তৈরি হয়েছে। তিনি কেন্দ্রীয় মন্ত্রীর জরুরি হস্তক্ষেপ দাবি করেন।
কংগ্রেস সাংসদ সৈয়দ নাসির হুসেন বিজেপি সরকারের বিরুদ্ধে "বুলডোজার রাজনীতি" চালানোর অভিযোগ এনে অবিলম্বে বিদ্যুৎ ও পানি সংযোগ চালুর দাবি জানান।কাশ্মীরের রাজনৈতিক নেতা মীরওয়াইজ উমর ফারুক ঘটনাটিকে অত্যন্ত উদ্বেগজনক আখ্যা দিয়ে বলেন, "যদি একটি আইনি স্বীকৃতিপ্রাপ্ত শতবর্ষী মসজিদকে এভাবে নিশানা করা হয়, তবে সাধারণ উপাসনালয়গুলোর নিরাপত্তা কোথায়?"
উল্লেখ্য, ২০২৬ সালের২৫ আগস্ট দিল্লি হাইকোর্ট মোদির বাসভবন সংলগ্ন এলাকার বস্তিবাসীদের ছয় সপ্তাহের মধ্যে এলাকা খালি করে অন্যত্র পুনর্বাসনের নির্দেশ দিয়েছিল। সেই উচ্ছেদ অভিযানের ধারাবাহিকতাতেই এই ঐতিহ্যবাহী মসজিদটিকে অননুমোদিত দাবি করে সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হয়েছে বলে জানা গেছে।