মানুষকে বই পড়ায় আগ্রহী করে তুলতে নগদ প্রণোদনা দিচ্ছে সিঙ্গাপুর

মুনা নিউজ ডেস্ক | ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ২২:৪২

ফাইল ছবি ফাইল ছবি
ট্রেনের অপেক্ষায় বসে থাকা কিংবা ক্যাফেতে একা সময় কাটানো—এমন অবসর মুহূর্তগুলোতে মানুষকে মোবাইলের পর্দায় অবিরাম স্ক্রল করার বদলে বই পড়ায় ফেরাতে অভিনব উদ্যোগ নিয়েছে সিঙ্গাপুর।
 
নাগরিকদের পড়ার অভ্যাস গড়ে তুলতে দেশটি শুরু করেছে পাঁচ বছর মেয়াদি জাতীয় কর্মসূচি। এর আওতায় সরকারি ওয়েবসাইটে কতক্ষণ বই পড়ছেন, তা নথিভুক্ত করলে নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থও পাবেন পাঠকেরা।
 
সিঙ্গাপুরের এই উদ্যোগের মূল লক্ষ্য শুধু বই পড়ার সময় বাড়ানো নয়; বরং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অর্থহীন ও অগভীর কনটেন্ট দেখার প্রবণতা কমিয়ে মানুষের মনোযোগ, চিন্তাশক্তি ও কল্পনাশক্তি বাড়ানো। 
 
অতিরিক্ত অনলাইন কনটেন্ট গ্রহণের ফলে মানুষের জ্ঞানীয় সক্ষমতা ও মনোযোগ কমে যাওয়ার যে প্রবণতাকে সাম্প্রতিক সময়ে ‘ব্রেন রট’ বলা হচ্ছে, সেটি মোকাবিলায় এই কর্মসূচিকে একটি পরীক্ষামূলক পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
 
সিঙ্গাপুরের ন্যাশনাল লাইব্রেরি বোর্ডের প্রধান মেলিসা ট্যাম বলেন, স্বল্পদৈর্ঘ্যের অনলাইন কনটেন্ট মানুষকে দ্রুত তথ্য জানতে সাহায্য করলেও দীর্ঘ সময় ধরে বই পড়ার অভ্যাস মনোযোগ, সমালোচনামূলক চিন্তা ও কল্পনাশক্তি শক্তিশালী করে। তাদের লক্ষ্য এমন একটি পাঠকসমাজ তৈরি করা, যারা কৌতূহলী, চিন্তাশীল, বিচক্ষণ এবং ক্রমবর্ধমান জটিল বিশ্বকে বুঝে সিদ্ধান্ত নিতে সক্ষম।
 
১৫ মিনিট পড়লেই পয়েন্ট
তবে বই পড়ে রাতারাতি বড়লোক হওয়ার সুযোগ নেই এই কর্মসূচিতে। বরং পাঠকদের নিয়মিত পড়ার অভ্যাস তৈরি করাই এর উদ্দেশ্য।
 
প্রতিদিন অন্তত ১৫ মিনিট বই পড়লে একজন পাঠক ২০টি ভার্চুয়াল কয়েন পাবেন। এক দিনে সর্বোচ্চ একটি পড়ার সেশন হিসাব করা যাবে। ১ হাজার কয়েন জমলে পাওয়া যাবে ১ সিঙ্গাপুর ডলার (বাংলাদেশি মুদ্রায় ৯৬ টাকা) । অর্থাৎ ৫০ দিন প্রতিদিন অন্তত ১৫ মিনিট করে পড়লে একজন পাঠক ১ সিঙ্গাপুর ডলার (বাংলাদেশি মুদ্রায় ৯৬ টাকা) আয় করতে পারবেন।
 
কর্মসূচিটি বর্তমানে পরীক্ষামূলকভাবে চালু হয়েছে এবং বছরের শেষ পর্যন্ত এর কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করা হবে। অংশগ্রহণকারীদের মতামতের ভিত্তিতে পরবর্তী সময়ে এতে নতুন ফিচার ও পরিবর্তন আনার পরিকল্পনা রয়েছে।
 
পাশাপাশি পাঠকদের একটি দাতব্য কর্মসূচিতেও অংশ নেওয়ার সুযোগ থাকছে। এ উদ্যোগের মাধ্যমে চলতি বছরে মোট ৭৫ লাখ মিনিট পড়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এই পাঠ-সময়ের মাধ্যমে সর্বোচ্চ ১ লাখ ১৮ হাজার ৩০০ ডলার বা ১ লাখ ৫০ হাজার সিঙ্গাপুর ডলার পর্যন্ত তহবিল সংগ্রহের আশা করছে কর্তৃপক্ষ।
 
বিশ্বজুড়ে কমছে পড়ার অভ্যাস
সিঙ্গাপুরের এই উদ্যোগ এমন এক সময়ে এসেছে, যখন বিশ্বজুড়েই মানুষের মনোযোগ ধরে রাখার ক্ষমতা কমছে এবং বই পড়ার অভ্যাসে ভাটা পড়ছে। শিক্ষাবিদ ও গবেষকেরা বিশেষ করে শিশু-কিশোরদের মধ্যে অতিরিক্ত ডিজিটাল নির্ভরতা নিয়ে উদ্বিগ্ন।
 
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দ্রুত বদলে যাওয়া ভিডিও, ছোট পোস্ট ও অন্যান্য অগভীর কনটেন্টের প্রতি মানুষের আকর্ষণ বাড়ছে। একই সঙ্গে ‘ডুমস্ক্রলিং’—অর্থাৎ একটির পর একটি অনলাইন কনটেন্ট কোনও নির্দিষ্ট উদ্দেশ্য ছাড়াই দেখতে থাকা—দৈনন্দিন জীবনের অংশ হয়ে উঠেছে। এর ফলে দীর্ঘ সময় কোনও লেখা, বই বা জটিল বিষয় নিয়ে মনোযোগ ধরে রাখার ক্ষমতা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
 
সম্প্রতি প্রকাশিত বৈশ্বিক শিক্ষাগত সূচকেও বিষয়টি উঠে এসেছে। ১৫ বছর বয়সী শিক্ষার্থীদের পড়ার দক্ষতায় উল্লেখযোগ্য পতন দেখা গেছে। বিপরীতে সিঙ্গাপুর ও চীনের মতো এশীয় দেশগুলো এ ক্ষেত্রে তুলনামূলকভাবে ভালো করছে। তবে গবেষণায় শ্রেণিকক্ষে ডিজিটাল প্রযুক্তির কারণে বাড়তে থাকা মনোযোগ বিচ্ছিন্নতাকে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
 
শুধু পড়া নয়, গভীরভাবে পড়ার অভ্যাস
সিঙ্গাপুরের ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব এডুকেশনের গবেষক লোহ চিন ই বলেন, এই কর্মসূচির মূল বিষয় হলো বই পড়াকে একটি নিয়মিত অভ্যাসে পরিণত করা।
 
তার মতে, নিয়মিত বই পড়েন এমন কারও কাছে ১৫ মিনিট খুব অল্প সময় মনে হতে পারে। কিন্তু যারা দীর্ঘদিন বই পড়েন না, তাদের জন্য প্রতিদিন ১৫ মিনিটের লক্ষ্যটি একটি বাস্তবসম্মত সূচনা হতে পারে।
 
লোহ চিন বলেন, মানুষ এখনও অনেক কিছু পড়ে—বিশেষ করে মোবাইল বা কম্পিউটারের পর্দায়। কিন্তু গভীরভাবে পড়া, কোনও লেখা নিয়ে দীর্ঘ সময় ভাবা এবং পড়ার প্রতি ধারাবাহিকভাবে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ থাকার অভ্যাস আগের তুলনায় কমে যাচ্ছে।
 
পরীক্ষার চাপে বই থেকে দূরে তরুণেরা
পড়াশোনার ক্ষেত্রে সিঙ্গাপুর বিশ্বে অন্যতম সফল দেশ হলেও শিক্ষার্থীরা মাধ্যমিক পর্যায়ে ওঠার পর অবসরের জন্য বই পড়ার আগ্রহ হারিয়ে ফেলছে বলে উদ্বেগ রয়েছে। বড় পরীক্ষার প্রস্তুতির চাপ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে পড়াশোনা অনেক সময় পরীক্ষাকেন্দ্রিক হয়ে পড়ে। ফলে বই পড়ার আনন্দ ধীরে ধীরে হারিয়ে যায়।
 
সিঙ্গাপুরের ৩২ বছর বয়সী ঝুঁকি বিশ্লেষক আইজ্যাক নিও বলেন, কিশোর বয়সে পড়াশোনার চাপ অনেক বেড়ে যায়। বড় বড় পরীক্ষার প্রস্তুতির সময় শিক্ষার্থীরা শুধু পরীক্ষায় আসবে এমন বিষয়ই পড়তে শুরু করে। ধীরে ধীরে অবসরে আনন্দের জন্য বই পড়ার অভ্যাসটি হারিয়ে যায়।
 
কর্মজীবনে প্রবেশের পর নিজের ক্ষেত্রেও একই ঘটনা ঘটেছিল নিওর। বহু বছর বই না পড়ার বিষয়টি উপলব্ধি করার পর ২০২৫ সালে তিনি ‘মডার্ন মেনস বুক ক্লাব’ নামে একটি বই পড়ার ক্লাব প্রতিষ্ঠা করেন।
 
নিও বলেন, ক্লাবের অনেক সদস্য তাকে জানিয়েছেন, দীর্ঘদিন বই পড়েননি। এখন আবার পড়ার অভ্যাস তৈরি করাই তাদের এই ক্লাবে যোগ দেওয়ার অন্যতম কারণ। এমনকি অনেকে আগে যে ধরনের বই পড়তেন না, সেসব নতুন ধারার বইয়েও আগ্রহী হয়ে উঠছেন।
 
টাকা দিয়ে কি বই পড়ার ভালোবাসা তৈরি করা যায়?
সিঙ্গাপুর সরকারের উদ্যোগটি অবশ্য বিতর্কও তৈরি করেছে। সমালোচকদের প্রশ্ন, বই পড়ার মতো একটি অভ্যাসের সঙ্গে অর্থের পুরস্কার যুক্ত করলে সত্যিকার অর্থে মানুষের মধ্যে আজীবনের পাঠাভ্যাস তৈরি হবে কি না।
 
কারও মতে, বই পড়া উচিত বইয়ের প্রতি ভালোবাসা থেকেই। অর্থের বিনিময়ে পড়ার অভ্যাস তৈরি করলে পুরস্কার বন্ধ হওয়ার পর সেই অভ্যাসও হারিয়ে যেতে পারে।
 
তবে অন্য একটি পক্ষের যুক্তি, অতিরিক্ত ডিজিটাল বিনোদনের এই সময়ে মানুষকে যেকোনও উপায়ে বইয়ের কাছে ফিরিয়ে আনা ইতিবাচক। সিঙ্গাপুরের বই ও জীবনধারা বিষয়ক কনটেন্ট নির্মাতা চারমেইন লিম মনে করেন, মানুষ বই পড়তে গিয়ে ট্রেন বা বাসের স্টপেজ পার করে ফেললেও সেটি টিকটক কিংবা এআই-নির্মিত ভিডিও দেখার চেয়ে ভালো।
 
বই ক্লাব পরিচালনাকারী অ্যাশলি চিয়ার মতে, মানুষকে প্রতিদিন অন্তত ১৫ মিনিট পড়তে উৎসাহিত করা একটি ভালো সূচনা। তবে সাফল্য শুধু কত মিনিট পড়া হলো, তার ওপর নির্ভর করা উচিত নয়। বরং মানুষ কতটা কৌতূহলী পাঠকে পরিণত হলো, সেটিও বিবেচনায় নিতে হবে।
 
অর্থের পুরস্কারে দীর্ঘমেয়াদি অভ্যাস নিয়ে প্রশ্ন
মনোবিজ্ঞানীদের একাংশ অবশ্য অর্থনৈতিক প্রণোদনার দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব নিয়ে সতর্ক করেছেন। বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, কোনও কাজের জন্য নিয়মিত অর্থ বা পুরস্কার দেওয়া হলে তা বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর ওই কাজটি করার স্বাভাবিক আগ্রহ কমে যেতে পারে।
 
সিঙ্গাপুরের পুত্রা স্টার কেয়ারের প্রধান ক্লিনিক্যাল সাইকোলজিস্ট চারিসা এনজি বলেন, যারা আগে থেকেই কিছুটা বই পড়তে আগ্রহী, তাদের ক্ষেত্রে অর্থনৈতিক পুরস্কার কার্যকর হতে পারে। কিন্তু যাদের বই পড়ার প্রতি কোনও আগ্রহই নেই, তাদের মধ্যে দীর্ঘস্থায়ী ও স্বতঃস্ফূর্ত পাঠাভ্যাস গড়ে তুলতে অর্থের প্রণোদনা কতটা কার্যকর হবে, তা নিয়ে সন্দেহ রয়েছে।
 
ফলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অ্যালগরিদম-নির্ভর তাৎক্ষণিক আনন্দ ও ডোপামিনের আকর্ষণকে ছোট অঙ্কের অর্থ দিয়ে কতটা প্রতিহত করা সম্ভব, সেটিই এখন দেখার বিষয়।
 
তবে পরিচ্ছন্নতা, নাগরিক সৌজন্যসহ বিভিন্ন বিষয়ে জাতীয় পর্যায়ের প্রচারণার মাধ্যমে ইতিবাচক সামাজিক অভ্যাস গড়ে তোলার নজির রয়েছে সিঙ্গাপুরে। সেই অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে সরকার মনে করছে, বই পড়ার ক্ষেত্রেও সামান্য উৎসাহ ও ছোট্ট পুরস্কার হয়তো মানুষকে আবার বইয়ের পাতা উল্টাতে উৎসাহিত করতে পারে।