বিশ্ববাজারে জ্বালানির দাম বাড়ায় অর্থসংকটের মুখে বিপিসি

মুনা নিউজ ডেস্ক | ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ২১:৫২

ছবি: গ্রাফিক্স ছবি: গ্রাফিক্স
বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের ঊর্ধ্বমূল্যের কারণে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) আর্থিক চাপে রয়েছে। সরকার যদি নতুন করে অর্থায়নের ব্যবস্থা না করে, তবে আগামী অক্টোবরের কোনো এক সময়ে জ্বালানি আমদানির জন্য ঋণপত্র (এলসি) খোলার তহবিল সংকটে পড়তে পারে সংস্থাটি।
 
৬ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী, বিপিসির কাছে বর্তমানে প্রায় ১২ হাজার ৩৬৮ কোটি টাকার কার্যকরী মূলধন রয়েছে। এই অর্থ দিয়ে সেপ্টেম্বরের জ্বালানি আমদানির ব্যয় মেটানো সম্ভব হলেও এরপর আমদানি কার্যক্রম চালিয়ে নিতে সংস্থাটির আরও তহবিলের প্রয়োজন হবে।
 
বিপিসির মতে, জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে অন্তত দুই মাসের জ্বালানি আমদানি খরচের সমপরিমাণ কার্যকরী মূলধন তাদের হাতে রাখা জরুরি। বর্তমান আন্তর্জাতিক বাজারদর অনুযায়ী, এই লক্ষ্য পূরণে তাদের অতিরিক্ত ১৫ হাজার থেকে ২০ হাজার কোটি টাকার প্রয়োজন।
 
তবে বিপিসি আশা করছে যে, এই তহবিল সংকটের কারণে জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থায় তাৎক্ষণিক কোনো ব্যাঘাত ঘটবে না।
 
গত ৮ সেপ্টেম্বর জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের সচিবের কাছে পাঠানো এক চিঠিতে বিপিসির চেয়ারম্যান মো. রফিকুল ইসলাম সংস্থাটির বর্তমান আর্থিক পরিস্থিতির কথা তুলে ধরেন এবং এই চাপ কমাতে জরুরি পদক্ষেপ গ্রহণের অনুরোধ জানান।
 
চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে, মার্চ থেকে আগস্ট মাসের মধ্যে জ্বালানি তেল আমদানির এলসি নিষ্পত্তি করতে গিয়ে বিপিসি ২২ হাজার ৮৭৬ কোটি টাকা লোকসানে পড়েছে। সংস্থাটি এই পরিমাণ অর্থ সরকারি ভর্তুকি চেয়েছে।
 
বিপিসির তথ্য অনুযায়ী, মূলত বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম বাড়লেও দেশের বাজারে সেই অনুপাতে দাম না বাড়ানোয় এই লোকসান হয়েছে। যদিও জ্বালানির দাম নির্ধারণের একটি স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা চালু রয়েছে, তবুও মার্চ মাস থেকে আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে দেশের বাজারে দাম সমন্বয় করা হয়নি।
 
সেপ্টেম্বর মাসের জন্য বিপিসি ডিজেল প্রতি লিটার ১৮৭ টাকা, অকটেন ১৫৪ টাকা, পেট্রোল ১৫০ টাকা এবং কেরোসিন ১৪৬ টাকা করার প্রস্তাব দিয়েছিল। তবে জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ সেই দাম অপরিবর্তিত রেখে যথাক্রমে ১১৫ টাকা, ১৪৫ টাকা, ১৪০ টাকা এবং ১৩৫ টাকা বহাল রেখেছে।
 
এ ছাড়া, বিপিসির জ্বালানি আমদানির ব্যয়ও অনেক বেড়ে গেছে। সংস্থাটির তথ্য অনুযায়ী, শুল্ক, কর এবং পরিচালন ব্যয় বাদে গত আগস্ট মাসে তাদের জ্বালানি আমদানি ব্যয় দাঁড়িয়েছে ৭ হাজার ৬০৩ কোটি টাকা, যা গত বছরের একই মাসে ছিল ২ হাজার ৭৪১ কোটি টাকা।
 
আমদানির ব্যয় মেটানোর জন্য বিপিসি এরইমধ্যে ইস্টার্ন রিফাইনারির দ্বিতীয় ইউনিট এবং অন্যান্য উন্নয়ন প্রকল্পের জন্য নির্ধারিত তহবিল থেকে ১৯ হাজার ৫০০ কোটি টাকা তুলে নিয়েছে।
 
বিপিসির তথ্য অনুযায়ী, এই টাকা তুলে নেওয়ার পর প্রকল্পগুলোর অ্যাকাউন্টে এখন মাত্র ১ হাজার ৬৭৯ দশমিক ৭২ কোটি টাকা অবশিষ্ট রয়েছে।
 
আগামী মাসগুলোতে বিপিসিকে বড় অঙ্কের বেশ কিছু অর্থ পরিশোধ করতে হবে। এর মধ্যে এলপিজি ট্যাংক স্থাপনের জন্য জমি অধিগ্রহণে সেপ্টেম্বরে প্রায় ৫২৪ কোটি টাকা এবং ডিসেম্বরের মধ্যে সিঙ্গেল পয়েন্ট মুরিং (এসপিএম) প্রকল্পের ঋণ পরিশোধের জন্য আরও ৬৯০ কোটি টাকার প্রয়োজন।
 
চিঠিতে আরও বলা হয়েছে, ডিসেম্বর পর্যন্ত বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পের খরচ মেটাতে সংস্থাটির আরও প্রায় সাড়ে ৩ হাজার কোটি টাকার প্রয়োজন হতে পারে।
 
পাশাপাশি, ইন্টারন্যাশনাল ইসলামিক ট্রেড ফাইন্যান্স করপোরেশনের (আইআইটিএফসি) ঋণের কিস্তিগুলোও বিপিসিকে সময়মতো পরিশোধ করতে হবে।
 
৮ সেপ্টেম্বরের ওই চিঠিতে আরও উল্লেখ করা হয়েছে যে, বিপিসি এর আগে মার্চ থেকে জুন মাস পর্যন্ত সময়ের জন্য অর্থ মন্ত্রণালয়ের কাছে ভর্তুকি চেয়েছিল, কিন্তু সেই অর্থ এখনও পাওয়া যায়নি।
 
বিপিসি এখন তাদের জমে থাকা লোকসানের অর্থ জরুরি ভিত্তিতে পরিশোধের দাবি জানিয়েছে এবং তাৎক্ষণিক তহবিল পাওয়ার লক্ষ্যে অর্থমন্ত্রীর কাছে একটি 'ডেমি-অফিসিয়াল' (ডিও) চিঠি পাঠানোর প্রস্তাব করেছে।
 
পাশাপাশি, সংস্থাটি দেশের সামগ্রিক জ্বালানি পরিস্থিতি সম্পর্কে প্রধানমন্ত্রীকে অবহিত করারও সুপারিশ করেছে।
 
২০২৫ সালের জুন মাস থেকে বিপিসি অতিরিক্ত আর্থিক চাপের মুখে পড়েছে, কারণ সরকার এখন থেকে আমদানিকৃত পেট্রোলিয়াম পণ্যের ওপর শুল্ক ও কর নির্ধারণ করছে পণ্যের প্রকৃত আমদানি মূল্য বা ইনভয়েস মূল্যের ভিত্তিতে, যা আগে ট্যারিফ মূল্যের ভিত্তিতে করা হতো।
 
বিপিসির ভাষ্যমতে, এই পরিবর্তনের কারণে পূর্ববর্তী ব্যবস্থার তুলনায় তাদের করের বোঝা প্রতি লিটারে প্রায় ১৫ থেকে ২০ টাকা বেড়ে গেছে। সংস্থাটির তথ্য অনুযায়ী, আগস্ট মাসে ডিজেলের ওপর মোট শুল্ক ও করের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রতি লিটারে ৩২ দশমিক ৪৪ টাকা।
 
বিপিসি সরকারের নিকট প্রস্তাব পেশ করেছে, যেন পূর্বের শুল্ক কাঠামো পুনরায় কার্যকর করা হয় অথবা চলমান ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতির উন্নতি না হওয়া পর্যন্ত শুল্ক ও কর সাময়িকভাবে মওকুফ করা হয়।
 
এ ছাড়া, সংস্থাটি আন্তর্জাতিক বাজারের সাথে সামঞ্জস্য রেখে নিয়মিতভাবে দেশের বাজারে জ্বালানির দাম সমন্বয় করারও আহ্বান জানিয়েছে।
 
বিপিসি চেয়ারম্যান মো. রফিকুল ইসলাম গতকাল জানান, জ্বালানি আমদানি নিরবচ্ছিন্ন রাখতে সরকার এতদিন ভর্তুকি দিয়ে আসছে। কিন্তু আগামী মাসগুলোতে আমদানি কার্যক্রম নির্বিঘ্নে চালিয়ে নিতে সংস্থাটির এখন অতিরিক্ত অর্থের প্রয়োজন।
 
তিনি বলেন, ‘আমরা আশা করছি সরকার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করবে এবং জ্বালানি আমদানিতে কোনো ব্যাঘাত ঘটবে না।’
 
তিনি আরও জানান, এই সমস্যা নিয়ে আলোচনা করতে আজ অর্থ মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে তার একটি বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে।
 
জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী অনিন্ ইসলাম অমিত বলেন, ‘জ্বালানি সরবরাহ নিরবচ্ছিন্ন রাখার সঙ্গে সম্পর্কিত প্রতিটি বিষয়কেই সরকার সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিচ্ছে। আমরা অর্থ মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে ভর্তুকির বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করছি এবং খুব দ্রুতই এর সমাধান হবে বলে আশা করছি।’