বাংলাদেশ-চীন সহযোগিতা আরও গভীর করার আহ্বান জানালেন পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা

মুনা নিউজ ডেস্ক | ৩ আগস্ট ২০২৬ ২০:৫৩

ফাইল ছবি ফাইল ছবি

প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির বলেছেন, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও আঞ্চলিক সংযোগ জোরদারে পরিবহন অবকাঠামো, বিমান চলাচল এবং ডিজিটাল নেটওয়ার্কে বিনিয়োগ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে তিনি জ্ঞান বিনিময় ও প্রাতিষ্ঠানিক অংশীদারিত্বের মাধ্যমে বাংলাদেশ-চীন সহযোগিতা আরও গভীর করার আহ্বান জানিয়েছেন। অন্যদিকে, ঢাকায় নিযুক্ত চীনা রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েন বলেছেন, আগামী ৫০ বছরে বাংলাদেশ-চীন সম্পর্ক অর্থনীতি, বাণিজ্য, প্রযুক্তি, অবকাঠামো ও সংযোগের ক্ষেত্রে নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করতে পারে।

পররাষ্ট্র উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির বলেন, বাংলাদেশের কৌশলগত ভৌগোলিক অবস্থান আঞ্চলিক সংযোগ শক্তিশালী করার পাশাপাশি বাণিজ্য, পর্যটন, বিনিয়োগ ও সাংস্কৃতিক বিনিময়ে সহযোগিতা সম্প্রসারণের উল্লেখযোগ্য সুযোগ সৃষ্টি করেছে।

সোমবার রাজধানীর পুরাতন এলিফ্যান্ট রোডে অবস্থিত বিআইআইএসএস মিলনায়তনে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল অ্যান্ড স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজ (বিআইআইএসএস) এবং চীনের ফুদান বিশ্ববিদ্যালয়ের স্কুল অব ইন্টারন্যাশনাল রিলেশনস অ্যান্ড পাবলিক অ্যাফেয়ার্স (এসআইআরপিএ) যৌথভাবে আয়োজিত চারদিনব্যাপী ‘কমপারেটিভ গভর্ন্যান্স ফোরাম-২০২৬’-এর উদ্বোধনী অধিবেশনে প্রধান অতিথির বক্তব্যে পররাষ্ট্র উপদেষ্টা এসব কথা বলেন। হুমায়ুন কবির বলেন, আমাদের জনগণের কল্যাণে টেকসই অবকাঠামো, বিমান চলাচল, পর্যটন ও উদ্ভাবনের উন্নয়নে চীন এবং অন্যান্য আন্তর্জাতিক অংশীদারদের সঙ্গে আরও বিস্তৃত সহযোগিতাকে আমরা স্বাগত জানাই।

তিনি বলেন, ভবিষ্যতের সমৃদ্ধি শুধু অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ওপর নির্ভর করবে না; বরং প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা, সামাজিক সহনশীলতা এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতার মানের ওপরও নির্ভর করবে। তিনি বলেন, গ্লোবাল সাউথভুক্ত দেশগুলো বৈশ্বিক শাসনব্যবস্থা ও টেকসই উন্নয়ন নির্ধারণে ক্রমেই আরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। বাংলাদেশ বিশ্বাস করে, আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা হতে হবে আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক, বিধিভিত্তিক এবং সব দেশের জনগণের আকাক্সক্ষার প্রতি আরও সংবেদনশীল।

উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য দেন বাংলাদেশে নিযুক্ত চীনের রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েন, ফুদান বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস চ্যান্সেলর প্রফেসর চেন ঝিমিন এবং বিআইআইএসএস-এর মহাপরিচালক মেজর জেনারেল রিদওয়ানুর রহমান।বহুপাক্ষিকতা ও শান্তিপূর্ণ সংলাপের প্রতি বাংলাদেশের সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করে হুমায়ূন কবির বলেন, পারস্পরিক শ্রদ্ধার ভিত্তিতে গড়ে ওঠা জ্ঞান, আস্থা ও অংশীদারিত্বেই টেকসই অগ্রগতি সম্ভব। তিনি বলেন, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি সমৃদ্ধি আনে, কিন্তু প্রজ্ঞা, সহযোগিতা ও পারস্পরিক বোঝাপড়াই শেষ পর্যন্ত শান্তি ও টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করে।

তুলনামূলক শাসনব্যবস্থার গুরুত্ব তুলে ধরে তিনি বলেন, গত চার দশকে চীনেরbউল্লেখযোগ্য উন্নয়ন অভিজ্ঞতা থেকে বাংলাদেশের অনেক কিছু শেখার রয়েছে। একই সঙ্গে সুশাসন ও জননীতির ক্ষেত্রে বাংলাদেশের নিজস্ব অভিজ্ঞতাও ভাগ করে নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। তিনি বলেন, তুলনামূলক শাসনব্যবস্থা মানে কোনো দেশের মডেল হুবহু অনুসরণ করা নয়; বরং সফল অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে তা নিজস্ব বাস্তবতা ও জাতীয় অগ্রাধিকারের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণভাবে প্রয়োগ করা।

চীনকে বিশ্বের অন্যতম সফল উন্নয়নগাঁথা উল্লেখ করে চীনা রাষ্ট্রদূত বলেন, ধারাবাহিক সংস্কারের মাধ্যমে দেশটি প্রায় ৮০ কোটি মানুষকে চরম দারিদ্র্য থেকে মুক্ত করেছে। একই সঙ্গে বৈদ্যুতিক যানবাহন, সৌরশক্তি, উন্নত উৎপাদনশিল্প এবং বৈজ্ঞানিক গবেষণায়ও উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে। তিনি বলেন, আগামী ৫০ বছরে বাংলাদেশ-চীন সম্পর্ক অর্থনীতি, বাণিজ্য, প্রযুক্তি, অবকাঠামো ও সংযোগের ক্ষেত্রে নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করতে পারে।

হুমায়ুন কবির বলেন, শুল্কমুক্ত বাজারসুবিধা, উৎপাদন খাতে সহযোগিতা, বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খল পুনর্বিন্যাস এবং উন্নত প্রযুক্তিনির্ভর শিল্পে অংশীদারিত্ব নিয়ে আলোচনা কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং বাংলাদেশের রপ্তানি বহুমুখীকরণে সহায়ক হতে পারে।

সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের বৈঠকের বিষয়ে আশাবাদ ব্যক্ত করে তিনি বলেন, এ বৈঠক দুই দেশের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ককে আরও শক্তিশালী করবে। তিনি বলেন, বাংলাদেশ ও চীনের দীর্ঘদিনের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক এখন একটি সমন্বিত কৌশলগত সহযোগিতা অংশীদারিত্বে উন্নীত হয়েছে। আর সম্প্রতি ঘোষিত ‘নিউ এরার জন্য বাংলাদেশ-চীন অভিন্ন ভবিষ্যতের কমিউনিটি’ দুই দেশের সম্পর্ককে নতুন উচ্চতায় নিয়ে গেছে।

বৈশ্বিক কৌশলগত প্রতিযোগিতা, দ্রুত প্রযুক্তিগত পরিবর্তন, জলবায়ু পরিবর্তন এবং পরিবর্তিত ভূরাজনৈতিক বাস্তবতার প্রসঙ্গ তুলে ধরে তিনি বলেন, কোনো দেশ একা এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে পারবে না। পারস্পরিক শ্রদ্ধা, সহযোগিতা এবং অভিজ্ঞতা বিনিময়ই এগিয়ে যাওয়ার পথ। তিনি আরও বলেন, সুশাসন ও জনসেবা উন্নত করতে গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান শক্তিশালী করা, জনপ্রশাসনের আধুনিকায়ন এবং ডিজিটাল রূপান্তর ত্বরান্বিত করা প্রয়োজন।

শিক্ষা, গবেষণা ও উদ্ভাবনকে ভবিষ্যতের কৌশলগত সম্পদ হিসেবে উল্লেখ করে তিনি বিআইআইএসএস ও ফুদান বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারককে (এমওইউ) দীর্ঘমেয়াদি একাডেমিক ও নীতিগত সহযোগিতার ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে অভিহিত করেন। জলবায়ু পরিবর্তনের বিষয়ে হুমায়ুন কবির বলেন, দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাস ও জলবায়ু সহনশীলতা অর্জনে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পেয়েছে। তবে ঝুঁকিপূর্ণ উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য আরও বেশি জলবায়ু অর্থায়ন, প্রযুক্তি হস্তান্তর এবং আন্তর্জাতিক সহায়তা নিশ্চিত করা জরুরি।



আপনার মূল্যবান মতামত দিন: