নদী ব্যবস্থাপনা ও বিনিয়োগে সহযোগিতা বাড়াতে সম্মত বাংলাদেশ ও চীন

মুনা নিউজ ডেস্ক | ২৫ জুন ২০২৬ ১৮:৩৩

ছবি: সংগৃহীত ছবি: সংগৃহীত

প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ও তার কার্যালয়ের মুখপাত্র মাহদী আমিন বলেছেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে বৃহস্পতিবার চীনের পানিসম্পদমন্ত্রী লি গোওইংয়ের বৈঠক হয়েছে। বৈঠকে তিস্তা মহাপরিকল্পনাসহ বাংলাদেশের বিভিন্ন নদী ব্যবস্থাপনা, বন্যা ঝুঁকি মোকাবিলা, নদী খনন, নদীভাঙন রোধ, সেচ ও নৌ-নেভিগেশন উন্নয়নে দুদেশের সহযোগিতা বাড়ানোর বিষয়ে ঐকমত্য হয়। চীনা মন্ত্রী এ খাতে একসঙ্গে কাজ করার আগ্রহ প্রকাশ করেন এবং গবেষণা, প্রশিক্ষণ ও প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বৃদ্ধিতে সহযোগিতার আগ্রহ প্রকাশ করেন।

বৃহস্পতিবার চীনের স্থানীয় সময় দুপুর ১টায় সেন্ট্রাল বেইজিংয়ের দিয়াওইউতাই হোটেলে সংবাদ সম্মেলন মাহদী আমিন একথা জানান। প্রধানমন্ত্রীর চীন সফর নিয়ে এই সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়।

মাহদী আমিন জানান, গণমানুষের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে আজ বেইজিংয়ের দিয়াওইউতাই অতিথি ভবনে চীনের কমিউনিস্ট পার্টির আন্তর্জাতিক বিভাগের মন্ত্রী লিউ হাইক্সিংয়ের পার্টি-টু-পার্টি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে তিনি বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক সহযোগিতা, টেকসই প্রবৃদ্ধি ও পারস্পরিক সমৃদ্ধির লক্ষ্যে আরও ঘনিষ্ঠ অংশীদারত্ব গড়ে তোলার আহ্বান জানান।

এ সময় চীনা পক্ষ দুই দেশের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও জনসম্পৃক্ততা আরও জোরদারের আগ্রহ প্রকাশ করে এবং বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব, নিরাপত্তা ও উন্নয়নে চীনের সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করে। উভয় পক্ষই উন্নয়ন, বিনিয়োগ, জনগণের সংযোগ ও পার্টি-টু-পার্টি সম্পর্ক আরও বিস্তৃত করার মাধ্যমে বাংলাদেশ-চীন সম্পর্ককে নতুন উচ্চতায় নেওয়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন। বৈঠকে বিএনপির সঙ্গে চীনা কমিউনিস্ট পার্টির একটি সমঝোতা স্মারক (মেমোরেন্ডাম অব আন্ডারস্ট্যান্ডিং) স্বাক্ষরিত হয়।

মাহদী আমিন জানান, শুক্রবার চীনের রাষ্ট্রপতি শি জিনপিং-এর সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর স্থানীয় সময় সকাল সাড়ে ১০টায়, অর্থাৎ বাংলাদেশ সময় সকাল সাড়ে ৮টায় ঐতিহাসিক গ্রেট হলে সাক্ষাৎ অনুষ্ঠিত হবে। চীনের প্রধানমন্ত্রী ও রাষ্ট্রপতির সঙ্গে বৈঠকে স্বাভাবিকভাবেই বাংলাদেশের স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিষয় তুলে ধরবেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। একই সঙ্গে বাংলাদেশের মানুষের উন্নয়ন-অগ্রযাত্রা আরও সুসংহত করার লক্ষ্যে ইতিবাচক ফল বয়ে আনবেন, ইনশাআল্লাহ।

প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের এ মুখপাত্র বলেন, চীনে রাষ্ট্রীয় সফরে বেশ কয়েকটি বৃহৎ শিল্পগোষ্ঠীর শীর্ষ কর্মকর্তারা ধারাবাহিকভাবে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। এ ছাড়া চায়না ইন্টারন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট কো-অপারেশন এজেন্সি, চায়না রেলওয়ে কনস্ট্রাকশন কর্পোরেশন, চায়না রোড অ্যান্ড ব্রিজ করপোরেশন, বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানের প্রধান, বিনিয়োগকারী, মন্ত্রী এবং বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করে বাংলাদেশের উন্নয়ন-অগ্রযাত্রায় বিনিয়োগ ও বাণিজ্য সম্প্রসারণে কীভাবে আরও কার্যকর ভূমিকা রাখা যায়, সে বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেন।

মাহদী আমিন বলেন, প্রথম বিদেশ সফরের তৃতীয় পর্বে চীনের প্রধানমন্ত্রীর আমন্ত্রণে তিনি বুধবার চীনের রাজধানী বেইজিংয়ে পৌঁছান। মালয়েশিয়া ও দালিয়ানের ধারাবাহিকতায় বেইজিংয়েও প্রধানমন্ত্রীকে সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় সম্মান, বর্ণাঢ্য লালগালিচার উষ্ণ অভ্যর্থনা ও আন্তরিক আতিথেয়তার মাধ্যমে বরণ করা হয়। মোটর শোভাযাত্রা, পূর্ণ রাষ্ট্রীয় প্রোটোকল ও উচ্চ পর্যায়ের পুলিশি নিরাপত্তার মধ্য দিয়ে তাকে দাওতি স্টেট গেস্টহাউজে নিয়ে যাওয়া হয়, যা সম্মানিত রাষ্ট্রীয় অতিথিদের জন্য নির্ধারিত এবং মর্যাদাপূর্ণ আবাসন সুবিধা হিসেবে ব্যবহৃত হয়। মালয়েশিয়া এবং ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের মতই এখানেও তিনি অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত আকারে মাত্র ২৫ জন সফরসঙ্গী নিয়ে সফর করেছেন, এর মধ্যে মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী ও উপদেষ্টা পদমর্যাদার ১১ জন রয়েছেন।

তিনি বলেন, মূলত চীনা প্রধানমন্ত্রীর আমন্ত্রণে বেইজিংয়ে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর এই সফরের উদ্দেশ্য হলো বাংলাদেশের ভূ-রাজনৈতিক ও কৌশলগত অবস্থান, ভারসাম্যপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতি, বাংলাদেশে চীনা বিনিয়োগ বৃদ্ধি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যের প্রসার, জনগণের সঙ্গে জনগণের সম্পর্ক জোরদার করা এবং শিক্ষা, সংস্কৃতি, তথ্যপ্রযুক্তি ও স্বাস্থ্যসহ জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন ক্ষেত্রে দুই দেশের মধ্যে আরও কার্যকর সহযোগিতা প্রতিষ্ঠা করা।

প্রধানমন্ত্রীর এ উপদেষ্টা বলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান চীনা বিনিয়োগকারীদের বাংলাদেশে বিনিয়োগের আহ্বান জানিয়ে বলেন, অর্থনৈতিক ও প্রশাসনিক সংস্কারের মাধ্যমে বাংলাদেশ উৎপাদন ও শিল্প খাতের নতুন গন্তব্য হিসেবে একটি প্রতিযোগিতামূলক, নির্ভরযোগ্য ও লাভজনক অংশীদার হতে পারে।

তিনি জানান, বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করতে সরকার ১৮০ দিনের বিশেষ কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়ন করছে। পাশাপাশি আনোয়ারা ও মোংলায় অর্থনৈতিক অঞ্চল উন্নয়ন, চীনে বাংলাদেশের প্রথম ইনভেস্টমেন্ট অফিস স্থাপন এবং অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত বিভিন্ন খাতে বিশেষ প্রণোদনা প্রদানের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া ১৫ দিনের কম সময়ের মধ্যে বিনিয়োগকারীদের নতুন লাইসেন্স প্রদান করা হবে।

প্রধানমন্ত্রীর এ উপদেষ্টা জানান, প্রথম বিদেশ সফরের দ্বিতীয় পর্বে প্রধানমন্ত্রী ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের আমন্ত্রণে চীনের দালিয়ানে যান। সেখানে তিনি ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরাম আয়োজিত “অ্যানুয়াল মিটিং অব দ্য নিউ চ্যাম্পিয়নস” সম্মেলনে অংশগ্রহণ করেন। এ সম্মেলনে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ এবং সাতটি দেশের প্রধানমন্ত্রী অংশগ্রহণ করেন। যেসব দেশের প্রধানমন্ত্রীরা এই অনুষ্ঠান অংশ নেন, তাদের মধ্যে ছিল চীন, দক্ষিণ কোরিয়া, মন্টিনিগ্রো, মঙ্গোলিয়া, গিনি এবং কাজাখস্তান। এছাড়া ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের প্রেসিডেন্ট ও সিইও প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। তিনি সেখানে সরকার গঠনের পর গত চার মাসে জলবায়ু খাতে গৃহীত বিভিন্ন উদ্যোগ বিশ্বদরবারে তুলে ধরেন।

মাহদী আমিন বলেন, ২০০২ সালে সাবেক প্রধানমন্ত্রী দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার সঙ্গে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান চীন সফরে এসে তিনি এ দেশ থেকে অনেক সমৃদ্ধ স্মৃতি নিয়ে গিয়েছিলেন। তার বাবা বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ১৯৭৭ ও ১৯৮০ সালের ঐতিহাসিক সফরের মাধ্যমে বাংলাদেশ-চীন বন্ধুত্বের ভিত্তি স্থাপন করেছিলেন। পরবর্তী সময় তার মা প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া সাতটি স্মরণীয় সফরের মাধ্যমে সেই বন্ধুত্বকে আরও সুদৃঢ় করেন। পিতা-মাতার সেই দলীয় ও পারিবারিক ঐতিহ্যকে ধারণ করে, বাংলাদেশ-চীন অংশীদারিত্বকে তিনি আরও উচ্চতায় নিয়ে যেতে বদ্ধপরিকর। একইসঙ্গে তাকে ও তার প্রতিনিধিদলকে যে আন্তরিক আতিথেয়তা দেওয়া হয়েছে, তা আমাদের জন্য অনুপ্রেরণাদায়ক। প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে আমরা ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ নীতিকে মাথায় রেখে চীনের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তুলতে বদ্ধপরিকর।

তিনি বলেন, আমরা দেশের স্বার্থ রক্ষা ও সম্পর্ক গঠনের ক্ষেত্রে সমতা ও ন্যায্যতাকে ভিত্তি হিসেবে ধারণ করতে চাই। বাংলাদেশ-চীন সম্পর্ককে বহুমাত্রিক ক্ষেত্রে আরও গভীর করতেই এই সফর। কৌশলগত সহযোগিতা থেকে শুরু করে বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান, এবং উন্নয়ন প্রকল্প থেকে জনগণের সঙ্গে জনগণের সম্পর্ক, সব ক্ষেত্রেই দুই দেশের দ্বিপাক্ষিক সম্পৃক্ততা নতুন উচ্চতায় পৌঁছাবে বলে।

মাহদী আমিন বলেন, দীর্ঘদিন পর জনগণের ভোটে নির্বাচিত একজন সরকারপ্রধান হিসেবে প্রধানমন্ত্রী মালয়েশিয়া, ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরাম এবং চীন সফরে যে মর্যাদা পাচ্ছেন এবং যেভাবে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বকে প্রাধান্য দিয়ে ভারসাম্যপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতি বাস্তবায়ন করছেন, তা বিশ্বদরবারে আমাদের জন্য অত্যন্ত গৌরব ও মর্যাদার বিষয়।

সংবাদ সম্মেলনে আরও উপস্থিত ছিলেন প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির, প্রধানমন্ত্রীর অতিরিক্ত প্রেস সচিব আতিকুর রহমান রুমন, উপ-প্রেস সচিব জাহিদুল ইসলাম রনি, সুজন মাহমুদসহ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা এবং বাংলাদেশ হাইকমিশনের কর্মকর্তারা।



আপনার মূল্যবান মতামত দিন: