ছবি: গ্রাফিক্স
ইরান যুদ্ধের অর্থনৈতিক অভিঘাতে বিশ্বজুড়ে অন্তত ৩ কোটি ২০ লাখ মানুষ চরম দারিদ্র্যের অতল গহ্বরে তলিয়ে যেতে পারে বলে সতর্কবার্তা দিয়েছে জাতিসংঘ। বিশেষ করে উন্নয়নশীল দেশগুলো এই সংকটের কারণে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
একটি ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি নিয়ে চলমান অনিশ্চয়তার মধ্যেই সোমবার জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচি (ইউএনডিপি) তাদের একটি বিশেষ প্রতিবেদনে এই ভয়াবহ তথ্য প্রকাশ করেছে। সংস্থাটির মতে, এই যুদ্ধের ফলে বিশ্ব অর্থনীতি বর্তমানে ‘ত্রিমুখী ধাক্কা’ বা ‘ট্রিপল শক’-এর মুখোমুখি হয়েছে, যার মধ্যে রয়েছে জ্বালানি সংকট, খাদ্য সংকট এবং মন্থর অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ানের সাংবাদিক রিচার্ড পারটিংটন এই প্রতিবেদনটি নিয়ে বিস্তারিত তথ্য তুলে ধরেছেন।
দারিদ্র্য বিমোচনে কাজ করা এই আন্তর্জাতিক সংস্থাটি জানিয়েছে যে, বর্তমান সংঘাত বিশ্বব্যাপী অর্জিত দীর্ঘদিনের উন্নয়নমূলক সাফল্যগুলোকে উল্টে দিচ্ছে। বিশেষ করে দরিদ্র অঞ্চলগুলোতে এই প্রভাব হবে অত্যন্ত অসম এবং সুদূরপ্রসারী। ইউএনডিপি-র প্রশাসক ও বেলজিয়ামের সাবেক প্রধানমন্ত্রী আলেকজান্ডার ডি ক্রু এই পরিস্থিতির গুরুত্ব ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বলেন যে, ‘এই ধরনের যুদ্ধ মূলত উন্নয়নকে পেছনের দিকে ঠেলে দেয়।
এমনকি যদি যুদ্ধ এখনই বন্ধ হয়ে যায় এবং একটি যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয়—যা অবশ্যই অত্যন্ত কাঙ্ক্ষিত—তথাপি এর নেতিবাচক প্রভাব ইতিমধ্যে সমাজ ও অর্থনীতিতে পড়ে গেছে।’ তাঁর মতে, এই সংঘাতের রেশ দীর্ঘদিন স্থায়ী হবে এবং বিশ্বের দরিদ্র দেশগুলোর সাধারণ মানুষকে নতুন করে দারিদ্র্যের দিকে ঠেলে দেবে।
তেহরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলি বিমান হামলার পর থেকেই বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম আকাশচুম্বী হতে শুরু করেছে। এর পাশাপাশি ইরানের পক্ষ থেকে হরমোজ প্রণালি বন্ধ করে দেওয়ার ফলে বিশ্ব অর্থনীতিতে তেল ও গ্যাসের সরবরাহ ব্যবস্থা চরমভাবে ব্যাহত হয়েছে।
জ্বালানি সংকটের এই প্রভাব কেবল বিদ্যুৎ বা যাতায়াতেই সীমাবদ্ধ নেই, বরং এটি সার উৎপাদন এবং বিশ্বব্যাপী পণ্যবাহী জাহাজ চলাচলেও বড় ধরনের সংকট তৈরি করেছে। কৃষি বিশেষজ্ঞদের মতে, এর ফলে উন্নয়নশীল দেশগুলোতে একটি ‘খাদ্য নিরাপত্তা টাইমবোম’ বা মহাবিপদ ঘনীভূত হচ্ছে। সারের অপ্রতুলতা এবং উচ্চমূল্যের কারণে সামনের দিনগুলোতে বিশ্বজুড়ে খাদ্যশস্যের উৎপাদন ভয়াবহভাবে হ্রাস পেতে পারে।
প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়েছে যে, বর্তমান এই সংকট নিরসনে দ্রুত আন্তর্জাতিক পদক্ষেপ নেওয়া না হলে অনেক দেশই দীর্ঘমেয়াদী অর্থনৈতিক মন্দার কবলে পড়বে। জাতিসংঘের এই তথ্য মূলত সেই দেশগুলোর জন্য একটি সতর্কতা, যারা ইতিমধ্যে উচ্চ মূল্যস্ফীতি এবং ঋণ সংকটে জর্জরিত।
আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থাগুলো মনে করছে যে, কেবল যুদ্ধবিরতিই এই সমস্যা সমাধানের জন্য যথেষ্ট নয়, বরং দারিদ্র্য বিমোচনে পুনরায় বিশ্বজুড়ে সমন্বিত সহায়তা প্রয়োজন। এই সংকটের ফলে গত এক দশকে বিশ্বজুড়ে অতি দারিদ্র্য দূর করার ক্ষেত্রে যে অগ্রগতি হয়েছিল, তা বড় ধরনের হুমকির মুখে পড়ল বলে সংস্থাটি মনে করছে।
আপনার মূল্যবান মতামত দিন: