বেইজিংয়ের হয়ে ‘গুপ্তচরবৃত্তি’ অভিযোগ স্বীকারের পর পদত্যাগ করলেন ক্যালিফোর্নিয়ার মেয়র

মুনা নিউজ ডেস্ক | ১৮ মে ২০২৬ ২৩:০২

ফাইল ছবি ফাইল ছবি
বেইজিংয়ের হয়ে ‘গুপ্তচরবৃত্তির’ অভিযোগ স্বীকার করার পর দক্ষিণ ক্যালিফোর্নিয়ার একটি শহরের মেয়র পদ থেকে পদত্যাগ করেছেন আইলিন ওয়াং। তবে স্থানীয় যুক্তরাষ্ট্রের সম্প্রদায়ের ওপর প্রভাব বিস্তারের লক্ষ্যে চীনের এ প্রচেষ্টায় মোটেও বিস্মিত নন বলে জানিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতি বিশ্লেষকরা।
 
৫৮ বছর বয়সী আইলিন ওয়াং গত সোমবার এ অভিযোগের সঙ্গে সম্পর্কিত একটি গুরুতর অভিযোগের দায় স্বীকার করতে সম্মত হয়েছেন। এর ফলে ফেডারেল কারাগারে তার সর্বোচ্চ ১০ বছর পর্যন্ত সাজা হতে পারে। 
 
বিচার বিভাগের কাছে দাখিল করা একটি স্বীকারোক্তিমূলক চুক্তি অনুযায়ী, ওয়াং এবং তার এক সহযোগী চীনের স্বার্থের পক্ষে প্রচার চালাতে দেশটির সরকারের সঙ্গে মিলে কাজ করেছিলেন। তারা স্থানীয় চীনা-আমেরিকান সম্প্রদায়ের জন্য একটি সংবাদ মাধ্যম হিসেবে দাবি করা একটি ওয়েবসাইটে বেইজিং-পন্থি প্রচারণা চালিয়েছিলেন।
 
এ তথ্য প্রকাশ্যে আসার পর আর্কাডিয়া শহরে তোলপাড় ও চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। বিপুল সংখ্যক এবং বিত্তশালী চীনা-আমেরিকান জনসংখ্যার কারণে শহরটিকে ‘চীনা বেভারলি হিলস’ বলা হয়। এ শহরের ৫৬,০০০ বাসিন্দার প্রায় অর্ধেকই চীনা বংশোদ্ভূত।
 
২০২২ সালের নির্বাচনে জয়ী হয়ে সিটি কাউন্সিলে যোগ দেওয়ার পর গত সপ্তাহে ওয়াং তার পদ থেকে ইস্তফা দেন। আর্কাডিয়ার নিয়ম অনুযায়ী সিটি কাউন্সিলররা পর্যায়ক্রমে মেয়রের দায়িত্ব পালন করেন এবং পদত্যাগের সময় ওয়াং মেয়র হিসেবে দায়িত্বরত ছিলেন। শহরের কর্মকর্তারা এ অভিযোগগুলোকে ‘গভীরভাবে উদ্বেগজনক’ বলে অভিহিত করেছেন এবং আর্কাডিয়াকে সামনে এগিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানিয়ে বলেছেন, একজন নারীর কর্মকাণ্ড যেন ‘আমাদের সম্প্রদায়ের পরিচয় নির্ধারণ না করে’।
 
কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশনস-এর দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া ও দক্ষিণ এশিয়া বিষয়ক সিনিয়র ফেলো জশুয়া কুরলান্টজিক বলেন, নিজেদের সীমান্তের বাইরে প্রভাব বিস্তারের জন্য চীনের এ ধরনের প্রচেষ্টা ‘খুবই সাধারণ’ একটি বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। বেইজিংয়ের এমন একটি সংস্থা রয়েছে যা বিদেশি সরকারগুলোর অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ করার জন্য নিবেদিত। এটি প্রবাসী সম্প্রদায়ের সঙ্গে কাজ করে, যার মূল লক্ষ্য অন্য দেশগুলোতে নিজেদের অনুকূলে বয়ান তৈরি করা, ভিন্নমত হ্রাস করা এবং রাজনৈতিক আলোচনার নিয়ন্ত্রণ নেওয়া।
 
কুরলান্টজিক বলেন, ‘স্থানীয় থেকে জাতীয় স্তর, সেইসঙ্গে গণমাধ্যম এবং ছাত্র সংগঠন—সব ক্ষেত্রেই বিভিন্ন দেশের রাজনীতিবিদদের ওপর প্রভাব বিস্তারে আগ্রহী চীন... এবং এর জন্য তাদের একটি বিশাল প্রচেষ্টা রয়েছে’।
 
তিনি আরও বলেন, ‘তাদের মনোযোগ দিন দিন মেয়র, রাজ্য আইনসভা ইত্যাদির দিকে বাড়ছে। কারণ এসব মানুষের জ্ঞান, অভিজ্ঞতা এবং নিজেদের রক্ষা করার মতো কর্মী বাহিনী তুলনামূলকভাবে কম থাকে’।
 
বিচার বিভাগ জানিয়েছে, ওয়াংয়ের অপরাধ স্বীকারের বিষয়টি আর্কাডিয়া সিটি কাউন্সিলে নির্বাচিত হওয়ার আগের কর্মকাণ্ডের সঙ্গে সম্পর্কিত। তবে কুরলান্টজিক বলেন, চীনের আশার একটি অংশ হলো, এই মানুষগুলো পরবর্তীতে আরও উচ্চ পদে ‘আরোহণ’ করতে পারবেন।
 
যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল আইন অনুযায়ী, কেউ যদি কোনো বিদেশি সরকারের পক্ষে কাজ করেন, তবে ‘ফরেন এজেন্টস রেজিস্ট্রেশন অ্যাক্ট’ বা অন্যান্য যুক্তরাষ্ট্রের আইনের অধীনে তার কাজের নিবন্ধন করা বাধ্যতামূলক। ওয়াংকে যুক্তরাষ্ট্রের আইনের এমন একটি ধারা লঙ্ঘনের জন্য অভিযুক্ত করা হয়েছে এবং এর ফলে তার সর্বোচ্চ ১০ বছরের কারাদণ্ড বা ২,৫০,০০০ ডলার জরিমানা হতে পারে।
 
ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়া, লস অ্যাঞ্জেলেস (ইউসিএলএ)-এর একজন আইনি বিশেষজ্ঞ রোজ চ্যান লুই, যিনি অলাভজনক সংস্থাগুলোকে বিদেশি এজেন্টের প্রতিবেদন দাখিলের নিয়মাবলী বুঝতে সহায়তা করেন, তিনি বলেন যে, যুক্তরাষ্ট্রের আইনটি বেশ বিস্তৃত।
 
তিনি বলেন, ‘বিষয়বস্তু কী তা বড় কথা নয়, যতক্ষণ না আপনি মনে করছেন এটি জনমতকে প্রভাবিত করবে। আপনার কেবল এ উদ্দেশ্যটুকুই থাকা যথেষ্ট। তারা যদি প্রমাণ করতে পারে যে, আপনি সেই বিদেশি ব্যক্তির এজেন্ট হিসেবে কাজ করছেন এবং আপনি সেই বিদেশি শক্তির জন্য রাজনৈতিক কার্যকলাপে জড়িত, তবে আপনার সেই কার্যক্রমের প্রতিবেদন দাখিল করা বাধ্যতামূলক’।
 
‘আপনি যদি জানেন যে, আপনার কর্মকাণ্ডের ফলে সেই বিদেশি সত্ত্বা সম্পর্কে জনমত প্রভাবিত হতে পারে, তবে যুক্তরাষ্ট্রের আইন আপনাকে এর আওতায় নিয়ে আসতে পারে’।
 
কুরলান্টজিক জোর দিয়ে বলেন, এ ধরনের প্রচেষ্টা কেবল চীনা-আমেরিকান বা চীনের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত সম্প্রদায়ের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। তিনি ২০২৩ সালে অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস (এপি)-এর একটি অনুসন্ধানের কথা উল্লেখ করেন, যেখানে দেখা গেছে যে ইউটাহ রাজ্যের কর্মকর্তাদের সঙ্গে চীন গভীর সম্পর্ক গড়ে তুলেছিল, যার মধ্যে তৎকালীন ইউটাহ হাউসের স্পিকারও ছিলেন। সে সময় ওই আইনপ্রণেতা রাজ্যটিকে চীনের ‘পুরানো বন্ধু’ হিসেবে বর্ণনা করেছিলেন।
 
জার্মান মার্শাল ফান্ড অব দ্য ইউনাইটেড স্টেটস-এর ইন্দো-প্যাসিফিক কর্মসূচির সিনিয়র ফেলো ম্যারেকা ওলবার্গ বলেন, বিদেশে নিজেদের স্বার্থ এগিয়ে নিতে বিদেশিদের ব্যবহারের চীনা প্রচেষ্টা নতুন কিছু নয়, তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এটি আরও পরিশীলিত হয়েছে।
 
ওলবার্গ বলেন, ‘চীনের পক্ষে কথা বলা, তাদের মূল বক্তব্যগুলোর পুনরাবৃত্তি করা বা ইতোমধ্যে যা প্রচার করা হয়েছে তা আরও জোরালো করার জন্য বিদেশিদের দলে টানা তাদের জন্য বেশ সাধারণ একটি বিষয়’। তিনি বলেন, চীনের মানসিকতা হলো ‘আপনাকে শত্রুতামূলক বয়ানের বিরুদ্ধে লড়াই করতে হবে এবং নিশ্চিত করতে হবে যেন তাদের জন্য কোনো জায়গা না থাকে’।
 
তিনি আরও বলেন, ‘নিয়ন্ত্রণ করা যায় না এমন কোনো বয়ান বাইরে থাকাকে তারা একটি বাস্তব হুমকি হিসেবে দেখে’।
 
ওয়াংয়ের ওয়েবসাইটের যে নিবন্ধগুলোর কথা বিচার বিভাগ অভিযোগপত্রে উল্লেখ করেছে, তার একটি লিখেছিলেন একজন চীনা কর্মকর্তা। সেই নিবন্ধে দাবি করা হয়েছিল যে, জিনজিয়াংয়ে ‘জোরপূর্বক শ্রম’ বা ‘গণহত্যা’ বলে কিছু নেই। মূলত উইঘুরদের ওপর চীনের দীর্ঘদিনের দমনপীড়নের বিস্তারিত প্রতিবেদনগুলোর পালটা জবাব দেওয়ার একটি প্রচেষ্টা ছিল এটি।
 
উইঘুর-আমেরিকান কর্মী রুশান আব্বাস, যার বোনকে ২০১৮ সালে আটক ও গ্রেফতার করা হয়েছিল, তিনি বলেন যে, ওয়াংয়ের গ্রেফতার ভিন্নমত দমন এবং বৈশ্বিক বয়ান নিজেদের পক্ষে নেওয়ার ক্ষেত্রে চীনের প্রচেষ্টার একটি উদ্বেগজনক স্মারক। আট বছর আগে যুক্তরাষ্ট্রে একটি অনুষ্ঠানে উইঘুরদের প্রতি চীনের আচরণ নিয়ে কথা বলেছিলেন আব্বাস। এর ঠিক এক সপ্তাহ পরই তার বোন গুলশান আব্বাস গ্রেফতার হন, যাকে পরে ২০ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়।
 
ওয়াংয়ের অপরাধ স্বীকারের প্রসঙ্গে আব্বাস বলেন, ‘এটি সবকিছুর চেয়েও বেশি দুঃখজনক, তবে আশ্চর্যজনক নয়। এটি একটি অত্যন্ত উদ্বেগজনক স্মারক যে, চীনা কমিউনিস্ট পার্টির হাত বিশ্বজুড়ে বিস্তৃত। আমি আনন্দিত যে, যুক্তরাষ্ট্রের জনগণ অবশেষে বুঝতে শুরু করেছে এটি কেমন সরকার এবং আমাদের চারপাশের সবাইকে কীভাবে চালিত করা যেতে পারে।’


আপনার মূল্যবান মতামত দিন: