আল জাজিরাকে ডা. শফিকুর রহমান

নারী নেতৃত্ব অসম্ভব, তবে ভবিষ্যতে নারী প্রার্থীদের প্রতিদ্বন্দ্বিতার জন্য প্রস্তুত করছে জামায়াত

মুনা নিউজ ডেস্ক | ২৯ জানুয়ারী ২০২৬ ১৯:২৭

ছবি : সংগৃহীত ছবি : সংগৃহীত

বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান আল জাজিরাকে দেওয়া এক দীর্ঘ সাক্ষাৎকারে স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন, দলের প্রধান (আমির) পদে কোনো নারী কখনো দায়িত্ব পালন করতে পারবেন না। তার ভাষায়, এটি “ঈশ্বরপ্রদত্ত সৃষ্টিগত পার্থক্যের কারণে সম্ভব নয়।”

সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন আল জাজিরার সাংবাদিক শ্রীনিবাসন জৈন। এতে আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন, ইসলামী আইন প্রয়োগ, নারী অধিকার, সংখ্যালঘু নিরাপত্তা, ১৯৭১ সালের ভূমিকা, গণমাধ্যম স্বাধীনতা ও বাংলাদেশ–ভারত সম্পর্কসহ নানা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে জামায়াতের অবস্থান তুলে ধরা হয়।

নারী নেতৃত্ব ও নির্বাচন প্রসঙ্গ

আল জাজিরার প্রশ্নে ডা. শফিকুর রহমান জানান, আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জামায়াতে ইসলামী কোনো নারী প্রার্থী দিচ্ছে না। তবে তিনি বলেন, দল নারীদের ভবিষ্যতের জন্য প্রস্তুত করছে এবং স্থানীয় সরকার পর্যায়ে নারীরা ইতোমধ্যেই নির্বাচনে অংশ নিয়ে সফল হয়েছেন। ভবিষ্যতে সংসদ নির্বাচনে নারী প্রার্থীর বিষয়টি বিবেচনায় নেওয়া হবে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।

তবে দলের প্রধান পদে নারীর দায়িত্ব গ্রহণের সম্ভাবনা নাকচ করে দিয়ে তিনি বলেন, “পুরুষ ও নারীর মধ্যে আল্লাহ প্রদত্ত কিছু মৌলিক পার্থক্য রয়েছে। একজন মা সন্তান জন্ম ও লালন-পালনের দায়িত্ব পালন করেন—এই সীমাবদ্ধতার কারণে সংগঠনের সর্বোচ্চ দায়িত্ব পালন করা সম্ভব নয়।”

এ বিষয়ে আল জাজিরার সাংবাদিক বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের নারী নেতৃত্বের উদাহরণ তুলে ধরলে, জামায়াত আমির বলেন, “বিশ্বের বেশিরভাগ দেশই নারীদের নেতৃত্বকে সম্ভব মনে করেনি—এটাই বাস্তবতা।”

ইসলামী আইন ও রাষ্ট্র পরিচালনা

ইসলামী আইন চালু করার প্রশ্নে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, জামায়াত বর্তমান সংবিধানের অধীনেই নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে এবং জনগণের ইচ্ছার বাইরে কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে না। তিনি বলেন, “যদি দেশের উন্নতির জন্য প্রয়োজন হয়, সংসদই সিদ্ধান্ত নেবে—আমি নই।”

তিনি দাবি করেন, জামায়াতের মূল লক্ষ্য দুর্নীতি দমন, স্বচ্ছতা, গণতান্ত্রিক অধিকার ও মানবাধিকার রক্ষা।

নারীদের কর্মঘণ্টা ও মাতৃত্বকালীন সুবিধা

নারীদের কর্মঘণ্টা কমানোর প্রস্তাব প্রসঙ্গে জামায়াত আমির বলেন, তার বক্তব্য বিকৃতভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে। তার ভাষায়, সন্তান জন্মদান ও লালন-পালনের সময় নারীদের প্রতি সম্মান দেখানো উচিত এবং ছয় মাসের মাতৃত্বকালীন ছুটি যথেষ্ট নয়।

তবে এ বিষয়ে আল জাজিরা বাংলাদেশের নারী শ্রমজীবীদের উদ্বেগ ও প্রতিবাদের কথা তুলে ধরলে, তিনি বলেন, এসব প্রতিবাদ “নগণ্য” এবং বাস্তবে নারীরা এতে স্বস্তি অনুভব করছেন।

গণমাধ্যম ও সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান নিয়ে বিতর্ক

সাম্প্রতিক সময়ে জামায়াত-সমর্থিত ছাত্রনেতাদের গণমাধ্যম ও সাংস্কৃতিক সংগঠনবিরোধী বক্তব্য প্রসঙ্গে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, এগুলো জামায়াতের আনুষ্ঠানিক অবস্থান নয়। তিনি জানান, এসব বক্তব্যের নিন্দা করা হয়েছে এবং বিষয়টি ইসলামী ছাত্রশিবিরের অভ্যন্তরীণ ব্যাপার।

সংখ্যালঘু ও ১৯৭১-এর ভূমিকা

সংখ্যালঘু নির্যাতনের অভিযোগ অস্বীকার করে জামায়াত আমির বলেন, এসব ঘটনায় জামায়াত জড়িত নয়। তিনি মানবাধিকার সংস্থাগুলোর প্রতিবেদনকে চ্যালেঞ্জ করে বলেন, নির্দিষ্টভাবে প্রমাণ দেওয়া হলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

১৯৭১ সালের যুদ্ধাপরাধ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, জামায়াত কোনো নৃশংসতায় জড়িত ছিল না এবং যুদ্ধাপরাধের বিচারকে “রাজনৈতিকভাবে প্রভাবিত ও বিতর্কিত” বলে অভিহিত করেন। তবে তিনি স্বীকার করেন, মানুষ দ্বারা গঠিত সংগঠন হিসেবে ভুল হতে পারে এবং সে জন্য অতীতে নিঃশর্ত ক্ষমা চেয়েছেন।

ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক

ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক প্রসঙ্গে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, জামায়াত ক্ষমতায় এলে ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক হবে ভ্রাতৃত্বপূর্ণ ও পারস্পরিক সম্মানের ভিত্তিতে। শেখ হাসিনাকে ফেরত পাঠানো নিয়ে ভারতের অস্বীকৃতির বিষয়টি সংলাপের মাধ্যমেই সমাধান হবে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

তরুণদের প্রত্যাশা

সাক্ষাৎকারের শেষাংশে তরুণদের প্রত্যাশা প্রসঙ্গে জামায়াত আমির বলেন, সাম্প্রতিক বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র সংসদ নির্বাচনে ইসলামী ছাত্রশিবিরের বিজয় প্রমাণ করে যে তরুণরা জামায়াতের দর্শনের ওপর আস্থা রাখছে। তার মতে, জনগণই চূড়ান্তভাবে সিদ্ধান্ত নেবে জামায়াত পরিবর্তন আনতে সক্ষম কি না।



আপনার মূল্যবান মতামত দিন: