মহাকাশে অস্ত্র মোতায়েন করেছে যুক্তরাষ্ট্র। এসব অস্ত্র যুক্তরাষ্ট্রের বাহিনীকে শত্রুপক্ষের হামলা থেকে সুরক্ষায় ব্যবহার করা হবে বলে জানিয়েছেন দেশটির বিমানবাহিনীর সচিব ট্রয় মেইঙ্ক। মহাকাশে এ ধরনের সক্ষমতার বিষয়ে এই প্রথম আনুষ্ঠানিকভাবে কথা বলল যুক্তরাষ্ট্র। সম্ভাব্য হুমকিদাতাদের উদ্দেশ্যে এটি দেশটির একটি বার্তা বলেও মনে করা হচ্ছে।
মেরিল্যান্ডের ন্যাশনাল হারবারে এয়ার অ্যান্ড স্পেস ফোর্সেস অ্যাসোসিয়েশনের আয়োজিত বার্ষিক এয়ার, স্পেস অ্যান্ড সাইবার সম্মেলনে সোমবার মেইঙ্ক বলেন, হুমকি যেখানেই তৈরি হোক, তা মোকাবেলায় আমরা প্রস্তুত রয়েছি। এ কারণেই যুক্তরাষ্ট্রের কাছে এখন মহাকাশ নিয়ন্ত্রণের এমন অস্ত্র রয়েছে, যা শত্রুপক্ষের হামলা থেকে যৌথ বাহিনীকে রক্ষা করতে সক্ষম।
তবে এসব অস্ত্রের ধরন বা সংখ্যা সম্পর্কে কোনো তথ্য দেননি মেইঙ্ক। এ বিষয়ে বিস্তারিত জানতে চাইলে তিনি আর কোনো তথ্য দিতে অস্বীকৃতি জানান। অস্ত্রগুলো ঠিক কখন পৃথিবীর কক্ষপথে পাঠানো হয়েছে, সেটিও জানা যায়নি।
২০১৯ সালে বিমানবাহিনীর অধীনে ইউএস স্পেস ফোর্স প্রতিষ্ঠা করেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। মহাকাশে দেশটির প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বাড়ানোর ক্ষেত্রে এটিকে ঐতিহাসিক পদক্ষেপ হিসেবে তুলে ধরেছেন তিনি। একই সময়ে চীন ও রাশিয়া মহাকাশে যুক্তরাষ্ট্রের আধিপত্যকে চ্যালেঞ্জ করায় অস্ত্র প্রতিযোগিতাও এগিয়ে যাচ্ছে।
ইউএস স্পেস ফোর্সের ওয়েবসাইটে বলা হয়েছে, সামরিক আধুনিকায়ন কৌশলের অংশ হিসেবে চীন মহাকাশ ও মহাকাশ প্রতিরোধ সক্ষমতা উন্নয়ন ও পরিচালনা করছে। অন্যদিকে রাশিয়া মহাকাশকে যুদ্ধের ক্ষেত্র হিসেবে বিবেচনা করে এবং ভবিষ্যৎ সংঘাতে মহাকাশে আধিপত্যকে গুরুত্বপূর্ণ নির্ধারক হিসেবে দেখে।
যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক কর্মকর্তারা দীর্ঘদিন ধরেই সতর্ক করে আসছেন, চীন ও রাশিয়া নতুন ধরনের আক্রমণাত্মক মহাকাশ সক্ষমতা পরীক্ষা করছে। এর মধ্যে রাশিয়ার স্যাটেলাইট কনস্টেলেশন নিয়ে প্রশিক্ষণ মিশনের কথা উল্লেখ করেছে ওয়াশিংটন। যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তাদের মতে, এসব মিশন ভবিষ্যৎ সংঘাতে ‘আক্রমণ ও প্রতিরক্ষার কৌশল’ প্রদর্শনের সক্ষমতা তৈরি করতে পারে। এ ছাড়া চীনের পারমাণবিক সক্ষমতাসম্পন্ন হাইপারসনিক ক্ষেপণাস্ত্র উন্নয়নের কথাও উল্লেখ করেছে যুক্তরাষ্ট্র।
২০২৪ সালে সিএনএন জানিয়েছিল, যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর ধারণা অনুযায়ী, রাশিয়া এরই মধ্যে মহাকাশভিত্তিক একটি পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির চেষ্টা করেছে। অস্ত্রটি বিপুল শক্তির তরঙ্গ বা ইলেকট্রোম্যাগনেটিক পালস সৃষ্টি করে বাণিজ্যিক ও সরকারি বিপুলসংখ্যক স্যাটেলাইট অচল করে দিতে পারে বলে ধারণা করা হয়। তবে মস্কো এ দাবি অস্বীকার করেছে।
এ ধরনের অস্ত্র ব্যবহৃত হলে এর প্রভাব ব্যাপক ও ভয়াবহ হতে পারে। আবহাওয়ার পূর্বাভাস ও দুর্যোগ মোকাবেলায় ব্যবহৃত স্যাটেলাইট থেকে শুরু করে ব্যাংকিং, পণ্য পরিবহন, রাইড শেয়ারিং ও অ্যাম্বুলেন্স সেবায় ব্যবহৃত বৈশ্বিক নেভিগেশন ব্যবস্থা পর্যন্ত ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
মেইঙ্ক বলেন, শুধু আকাশেই নয়, মহাকাশেও আমাদের আধিপত্য বজায় রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাই যখন আমরা হুমকির মুখে পড়ব, তখন তা মোকাবেলা করতে সক্ষম হওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে হয়েছে।
১৯৬৭ সালের আউটার স্পেস ট্রিটি পৃথিবীর কক্ষপথে পারমাণবিক অস্ত্র বা গণবিধ্বংসী অস্ত্র মোতায়েন নিষিদ্ধ করেছে। তবে মহাকাশে প্রচলিত অস্ত্র ব্যবহারের ওপর এতে নিষেধাজ্ঞা নেই। একইভাবে মহাকাশে থাকা কোনো স্থাপনা বা সম্পদের বিরুদ্ধে ভূ-পৃষ্ঠ থেকে প্রচলিত অস্ত্র ব্যবহারের বিষয়টিও চুক্তিতে নিষিদ্ধ করা হয়নি। ফলে এ ক্ষেত্রে ব্যাখ্যার সুযোগ রয়েছে।
গত ডিসেম্বরে ট্রাম্প একটি নির্বাহী আদেশে মহাকাশে যুক্তরাষ্ট্রের শ্রেষ্ঠত্বকে ‘জাতীয় দৃষ্টিভঙ্গি ও দৃঢ়তার পরিমাপক’ হিসেবে উল্লেখ করেন। এতে পরবর্তী প্রজন্মের ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি উন্নয়ন এবং মহাকাশে পারমাণবিক অস্ত্র মোতায়েনসহ বিভিন্ন হুমকি মোকাবেলায় যুক্তরাষ্ট্রের সক্ষমতা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেয়া হয়।
ট্রাম্পের প্রস্তাবিত ‘গোল্ডেন ডোম’ ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার দিকেও এটি একটি পদক্ষেপ। ইসরায়েলের আয়রন ডোমের আদলে প্রস্তাবিত এ প্রকল্পের মাধ্যমে বিশ্বের যেকোনো স্থান থেকে ছোড়া ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করার সক্ষমতা অর্জনের কথা জানিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তারা।
তবে ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাটি কীভাবে তৈরি করা হবে, সে বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্র এখনো বিস্তারিত কিছু জানায়নি। ট্রাম্প আশা প্রকাশ করেছেন, ২০২৮ সালের মধ্যে এটি সম্পন্ন হবে। সিএনএন এর আগে জানিয়েছিল, বিষয়টির সঙ্গে পরিচিত দুটি সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, পেন্টাগন ২০২৮ সালের নির্বাচনের ঠিক আগে এ ব্যবস্থার প্রথম বড় পরীক্ষা চালানোর সময় নির্ধারণ করেছে।
সোমবারের বক্তব্যে মেইঙ্ক জানান, যুক্তরাষ্ট্রের মহাকাশভিত্তিক ইন্টারসেপ্টর কর্মসূচি ‘প্রাথমিক চুক্তি থেকে এক বছরেরও কম সময়ে উড্ডয়ন-প্রস্তুত হার্ডওয়্যারে’ পৌঁছেছে। তবে এ কর্মসূচি সম্পর্কে তিনি আর কোনো বিস্তারিত তথ্য দেননি।