07/14/2026 কম্বোডিয়ায় ভালো চাকরির নামে ফাঁদে পড়ছে অসংখ্য বাংলাদেশি
মুনা নিউজ ডেস্ক
১৪ জুলাই ২০২৬ ১৮:৪৩
বিদেশে ভালো চাকরি, মোটা বেতন আর উন্নত জীবনের স্বপ্ন। সেই স্বপ্নই একসময় পরিণত হয় বন্দিদশা, নির্যাতন আর মৃত্যুভয়ের দুঃস্বপ্নে। এক এনজিওকর্মীর সঙ্গে পরিচয়ের সুবাদে বিদেশে চাকরির প্রস্তাব পান এক নারী। তাকে আশ্বস্ত করা হয়, কম্বোডিয়ায় একটি প্রতিষ্ঠানে সম্মানজনক চাকরি হবে। কিন্তু সেখানে পৌঁছানোর পর তিনি বুঝতে পারেন, যে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল তার সঙ্গে বাস্তবতার মিল নেই। পুলিশ বলছে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে কম্বোডিয়া দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অন্যতম বড় সাইবার স্ক্যাম কম্পাউন্ড বা অনলাইন প্রতারণা কেন্দ্র হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে। এ ব্যাপারে তদন্ত চলছে, বাড়ানো হয়েছে নজরদারি।
ফরিদপুরের ভাঙ্গা উপজেলার ভুক্তভোগী ওই নারীর অভিযোগ, তাকে জিম্মি করে রাখা হয়, পাসপোর্ট কেড়ে নেওয়া হয়, শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন চালানো হয় এবং একপর্যায়ে অন্য একটি চক্রের কাছে বিক্রি করে দেওয়ার হুমকিও দেওয়া হয়। পরে দেশে ফিরে তিনি বিমানবন্দর থানায় মানব পাচারের অভিযোগে মামলা করেন।
গত ২ জুলাই করা মামলায় অভিযোগ করা হয়েছে, পরিচিত কয়েকজন ব্যক্তি ও তাদের সহযোগীরা বিদেশে চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে তাকে কম্বোডিয়ায় পাঠানোর ব্যবস্থা করেন। চাকরির ভিসা, প্রসেসিং, টিকিটসহ বিভিন্ন খাতে ধাপে ধাপে অর্থ নেওয়া হয়। বিদেশে পৌঁছানোর পর প্রতিশ্রুত চাকরি না দিয়ে তাকে নিয়ন্ত্রণে রাখা হয় এবং দেশে ফিরতে চাইলে নানা ধরনের ভয়ভীতি দেখানো হয়। তার পাসপোর্ট নিজেদের কাছে রেখে দেওয়া হয় এবং শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের মাধ্যমে তাকে বাধ্য করার চেষ্টা করা হয়।
ওই নারীর ভাষ্য অনুযায়ী, বিদেশে অবস্থানকালে তাকে জানানো হয়, নির্দেশ না মানলে অন্য একটি চক্রের কাছে বিক্রি করে দেওয়া হবে। এমন পরিস্থিতিতে তিনি আতঙ্কের মধ্যে দিন কাটান। পরে বিভিন্ন মাধ্যমে সহযোগিতা পেয়ে দেশে ফিরতে সক্ষম হন এবং দেশে ফিরে মানব পাচার, প্রতারণা ও অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ এনে মামলা দায়ের করেন।
কম্বোডিয়া থেকে ফিরে আসা লক্ষ্মীপুর জেলার আরেক ভুক্তভোগী জানান, একটি রিক্রুটিং এজেন্সি ও দালাল চক্র তাকে কম্বোডিয়ায় একটি প্রতিষ্ঠানে কম্পিউটার অপারেটর হিসেবে চাকরির প্রতিশ্রুতি দেয়। এজন্য তার কাছ থেকে ৫ লাখ ৩০ হাজার টাকা নেওয়া হয় এবং বিএমইটির ছাড়পত্রও সংগ্রহ করা হয়। কিন্তু কম্বোডিয়ায় পৌঁছে তিনি মাত্র এক মাসের ভিজিট ভিসা পান। বিমানবন্দর থেকে তাকে গ্রহণ করে বাংলাদেশি দালালরা। পরে আর কোনো বৈধ কর্মভিসা দেওয়া হয়নি। বরং টাকার বিনিময়ে তাকে একটি সাইবার স্ক্যাম কম্পাউন্ডে বিক্রি করে দেওয়া হয়।
পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) বলছে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে কম্বোডিয়া দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অন্যতম বড় সাইবার স্ক্যাম কম্পাউন্ড বা অনলাইন প্রতারণা কেন্দ্র হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে। জাতিসংঘ, আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা এবং বিভিন্ন দেশের তদন্তে দেখা গেছে, বাংলাদেশসহ বিভিন্ন দেশ থেকে চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে মানুষ নিয়ে গিয়ে তাদের জোরপূর্বক অনলাইন প্রতারণার কাজে লাগানো হচ্ছে। কাজে অস্বীকৃতি জানালে মারধর, বিদ্যুৎস্পৃষ্ট করা, খাবার না দেওয়া, আটকে রাখা এবং মুক্তিপণ দাবি করার মতো অভিযোগও রয়েছে।
সিআইডির বিশেষ পুলিশ সুপার ড. জসীম উদ্দিন খান বলেন, চলতি বছরের জুন মাসে কয়েক দফায় অন্তত ৫০০-এর বেশি বাংলাদেশিকে কম্বোডিয়া থেকে দেশে ফিরিয়ে আনা হয়েছে। তারা যে চক্রের মাধ্যমে পাচারের শিকার হয়েছে সেগুলো নিয়ে তদন্ত চলছে।
এক বছরে ৫৮৩ বাংলাদেশির ফেরা : পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ দূতাবাস এবং ব্র্যাক মাইগ্রেশন প্রোগ্রামের সমন্বয়ে চলতি বছরের জুন মাসে কয়েক দফায় অন্তত ৫৮৩ বাংলাদেশিকে কম্বোডিয়া থেকে দেশে ফিরিয়ে আনা হয়েছে। ব্র্যাক মাইগ্রেশন প্রোগ্রামের তথ্যানুযায়ী, জুন মাসেই মোট ৫৮৩ জন বাংলাদেশি কম্বোডিয়া থেকে দেশে ফিরেছেন। এর মধ্যে শেষ চার দিনে ৩৬২ জন দেশে ফেরেন। এর আগে আরেক দফায় ২২১ জন দেশে ফেরেন। দেশে ফিরে অনেকেই অভিযোগ করেছেন, চাকরির প্রলোভনে নিয়ে গিয়ে তাদের জোর করে অনলাইন প্রতারণার কাজে বাধ্য করা হয়েছিল।
A Publication of MUNA National Communication, Media & Cultural Department. 1033 Glenmore Ave, Brooklyn, NY 11208, United States.