06/23/2026 কলকাতার সোহরাওয়ার্দী অ্যাভিনিউয়ের নাম পরিবর্তন ঘিরে ঐতিহাসিক ও রাজনৈতিক বিতর্কের জন্ম
মুনা নিউজ ডেস্ক
২৩ জুন ২০২৬ ১৯:১৪
কলকাতার একটি পরিচিত রাস্তা ‘সোহরাওয়ার্দী অ্যাভিনিউ’র নাম পাল্টে গোপাল মুখার্জী রোড করার ঘোষণা নিয়ে শুরু হয়েছে বিতর্ক। কলকাতা পৌর সংস্থার পক্ষ থেকে নেয়া নাম বদলের এই সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়ে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর একটি পোস্ট ওই বিতর্কে জুগিয়েছে আরো ইন্ধন।
হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী ছিলেন অবিভক্ত বাংলা প্রদেশের শেষ প্রধানমন্ত্রী। পরে তিনি পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রীও হয়েছিলেন। ‘দ্য গ্রেট ক্যালকাটা কিলিংস’ নামে পরিচিত ১৯৪৬ সালের দাঙ্গার সময়ে সোহরাওয়ার্দী ছিলেন প্রধানমন্ত্রী। দাঙ্গা থামাতে না পারা নিয়ে ইতিহাসবিদদের একাংশ তাকে দোষারোপ করেন।
রাস্তাটি অবশ্য তার নামে ছিলই না। কলকাতার পার্ক সার্কাস অঞ্চলের ওই রাস্তাটি আসলে ছিল হাসান সোহরাওয়ার্দীর নামে।
কলকাতা শহরের ইতিহাসবিদ হিসেবে যার গবেষণা উল্লেখযোগ্যভাবে স্বীকৃত, সেই পি থাঙ্কাপ্পন নায়ার তার বইতে তথ্যসূত্র দিয়ে সেকথা লিখে গেছেন।
হাসান সোহরাওয়ার্দী ছিলেন অধ্যাপক, কূটনৈতিক, শিল্প সমালোচক ও কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম মুসলমান ভিসি।
যে রাস্তার নাম বদলানো হয়েছে, সেখানেই শিক্ষাবিদ হাসান সোহরাওয়ার্দীর বাড়ি। সেখানে এখন রয়েছে কলকাতায় বাংলাদেশ উপ-দূতাবাসের গ্রন্থাগার ও তথ্য কেন্দ্র।
তবে হাসান সোহরাওয়ার্দী ও হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী দুজনেই অবশ্য সম্পর্কে মামা-ভাগ্নে।
কিন্তু দুই সোহরাওয়ার্দীর নাম গুলিয়ে ফেলেছেন অনেক সামাজিকমাধ্যম ব্যবহারকারী, এমনকি কয়েকটি সংবাদমাধ্যমও এই নাম বিভ্রাটে ভুল শিরোনামে সংবাদ প্রকাশ করেছিল।
বিতর্কের শুরু অবশ্য হয়েছে শুভেন্দু অধিকারীর দেয়া পোস্টকে ঘিরে।
‘এটি শুধুমাত্র একটি নাম পরিবর্তন নয়, ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ সংশোধন। দীর্ঘদিন ধরে কলকাতার প্রাণকেন্দ্রে এমন এক ব্যক্তির নাম বহন করা হয়েছে, যার ভূমিকা বিভাজন ও রক্তক্ষয়ের ইতিহাসের সাথে জড়িত। আজ সেই অধ্যায়ের সংশোধন করে সাহস, আত্মত্যাগ ও রক্ষকের প্রতীক শ্রী গোপাল মুখার্জীকে যথাযোগ্য সম্মান জানানো হলো,’ লেখা হয়েছিল শুভেন্দু অধিকারীর ভেরিয়ায়েড ফেসবুক পেজে।
তিনি যে রাজনীতিবিদ হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর দিকেই ইঙ্গিত করেছিলেন, তা স্পষ্ট।
আবার যার নামে রাস্তার নতুন নামকরণ হলো, সেই গোপাল মুখার্জীও সেই ‘দ্য গ্রেট ক্যালকাটা কিলিংস’র কারণেই পরিচিত।
হিন্দুত্ববাদীরা গোপাল মুখার্জী, যিনি ‘গোপাল পাঁঠা’ নামে সুপরিচিত, তাকে ১৯৪৬-এর দাঙ্গার সময়ে ‘হিন্দুদের রক্ষাকর্তা’ হিসেবে তুলে ধরেন, আবার একজন ‘মুসলিম-বিদ্বেষী’ হিসেবে চিত্রিত করার চেষ্টাও করেন কেউ কেউ।
তবে গোপাল মুখার্জী বিবিসিকে দেয়া সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন যে, হিন্দুদের রক্ষা করতে তিনি অস্ত্র হাতে নেমেছিলেন ঠিকই, কিন্তু অনেক মুসলমানেরও প্রাণ বাঁচিয়েছিলেন তখন।
এক বছর আগে মুক্তি পেয়েছিল পরিচালক ভিভেক অগ্নিহোত্রীর ছবি ‘দ্য বেঙ্গল ফাইলস’। ওই ছবিটি মুক্তির সময় তৎকালীন বিরোধী দলনেতা ও বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী বলেছিলেন যে, কলকাতায় গোপাল মুখার্জী ওরফে গোপাল পাঁঠার নামে একটি রাস্তা থাকা উচিত।
পরিচালক অগ্নিহোত্রী দাবি করেছিলেন, ‘কলকাতার কসাইয়ের নামে রাস্তা থাকলেও গোপাল পাঁঠার নামে রাস্তা নেই।’ এই গোপাল মুখার্জীকে তিনি কলকাতার দাঙ্গা থেকে ‘হিন্দুদের বাঁচানোর নেতা’ বলে উল্লেখ করেছিলেন।
মুখার্জীর একটি পাঁঠার মাংসের দোকান ছিল, যার থেকে তার নামকরণ হয় ‘গোপাল পাঁঠা’।
মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী কলকাতা পৌর সংস্থার নাম বদলের সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়ে ফেসবুকে লিখেছেন, ‘গতকাল পশ্চিমবঙ্গ দিবসের শুভক্ষণে সোহরাওয়ার্দী এভিনিউর নাম পরিবর্তন করে স্বর্গীয় গোপাল মুখার্জীর নামে “গোপাল মুখার্জী রোড” নামকরণ করার জন্য কলকাতা মিউনিসিপ্যাল করপোরেশনের গৃহীত এই ঐতিহাসিক সিদ্ধান্তকে আন্তরিকভাবে সাধুবাদ জানাই। এটি শুধু একটি নাম পরিবর্তন নয়, ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ সংশোধন।’
তবে গোপাল মুখার্জী হিন্দু মহাসভা বা অন্য কোনো হিন্দুত্ববাদী সংগঠনের সাথে জড়িত ছিলেন না, বরং কংগ্রেস নেতাদের ঘনিষ্ঠ ছিলেন বলেই জানা যায়।
যদিও গোপাল মুখার্জী বিবিসির সাক্ষাৎকারে দাবি করেছিলেন, ‘আমি ডাক্তার বিসি রায়ের (বিধান চন্দ্র রায়) ঘনিষ্ঠ ছিলাম। আমি কোনো পার্টির নই। আমি মানুষকে সাহায্য করি। আমি কোনো পার্টি করি না।’
যার নামে কলকাতার সোহরাওয়ার্দী অ্যাভিনিউয়ের নাম ছিল সেই হাসান সোহরাওয়ার্দী ছিলেন, রাজনীতিবিদ ও পরবর্তীকালে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর মামা। তিনি ছিলেন একজন শিক্ষাবিদ, জানাচ্ছিলেন গবেষক আলিমুজ্জামান। তিনি এই সোহরাওয়ার্দী পরিবারের ইতিহাস নিয়ে একটি বই রচনা করেছেন।
আলিমুজ্জামান জানান, হাসান সোহরাওয়ার্দীর গ্রেট ক্যালকাটা কিলিংয়ের সাথে যুক্ত, এমন কথা নিতান্তই ভুল। হাসান সোহরাওয়ার্দী এমন কোনো দাঙ্গার সাথে যুক্ত ছিলেন না।
‘তিনি ১৯৩০ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি হন এবং পরে তিনি লন্ডনের রয়্যাল কলেজ অফ সার্জনস এর ফেলো হন। স্বাধীনতা সংগ্রামী বীণা দাসের গুলির আক্রমণ থেকে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন চ্যান্সেলর স্ট্যানলি জ্যাকসনকে বাঁচিয়ে তিনি ব্রিটিশ সরকারের থেকে নাইট উপাধি লাভ করেছিলেন। পরে যদিও তিনি সেই উপাধি ত্যাগ করেছিলেন,’ বলছিলেন আলিমুজ্জামান।
বিবিসি রেডিওর জন্য সংবাদদাতা অ্যান্ড্রু হোয়াইটহেড কলকাতার ওয়েলিংটন স্কয়ারের কাছে একটা ঘরে বসে এক ঘণ্টারও বেশি সময় কথা বলেছিলেন গোপাল মুখার্জীর সাথে।
এই দুটি সাক্ষাৎকারই সম্ভব হয়েছিল বিবিসির সাবেক কর্মী নাজেস আফরোজের মাধ্যমে।
আফরোজ বলছিলেন, ‘আমি খুঁজে খুঁজে তাদের বের করেছিলাম সেই সময়ে। অনেক চেষ্টা করে কথা বলতে রাজি করিয়েছিলাম গোপাল মুখার্জীকে। ওটাই সম্ভবত প্রথম এবং এখন পর্যন্ত তার একমাত্র সাক্ষাৎকার।’
‘আমার ছেলেরা কত যে মেরেছে, তার হিসাব নেই,’ বলেছিলেন মুখার্জী। তবে তার ছেলেদের ওপরে কড়া নির্দেশ ছিল যে মুসলমান নারীদের বা সাধারণ মুসলমান মানুষের গায়ে যেন হাত না পড়ে।
‘গোপাল পাঁঠা’ ১৯৪২ সালের ‘ভারত ছাড়ো আন্দোলন’র সময়ে থেকেই দলবল জোগাড় করে রেখেছিলেন, তাদের কাছে সেই সময় থেকেই অস্ত্র মজুদ ছিল।
‘তবে ৪৬-এর দাঙ্গার সময়ে যে যেখান থেকে যা পেয়েছে, সে একখানা ছুরি-কাটারি কি তলোয়ার, বন্দুক, পিস্তল – আর কিছু সিকিওর করা ছিল ৪২-র মুভমেন্টের সময়ে,’ বিবিসিকে বলেছিলেন গোপাল মুখার্জী।
তিনি বলছিলেন যে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের সৈন্যবাহিনী যখন কলকাতায় অবস্থান নিয়েছিল, তাদের কাছ থেকেও অস্ত্র কিনে রাখা হয়েছিল।
‘আড়াই শ’ টাকা দিলে একটা ৪৫ পিস্তল (পয়েন্ট ৪৫ পিস্তল) আর ১০০ কার্টিজ দিয়ে দিত। এক বোতল হুইস্কি কিনে দিলে একটা পিস্তল আর এক শ’ কার্টিজ দিয়ে দিত। এইভাবে সিকিওর করেছি,’ বলেছিলেন গোপাল মুখার্জী।
A Publication of MUNA National Communication, Media & Cultural Department. 1033 Glenmore Ave, Brooklyn, NY 11208, United States.