চীনের সশস্ত্র বাহিনী গত বছরের শেষের দিকে গোপনে প্রায় ২০০ রুশ সেনাদের প্রশিক্ষণ দিয়েছে এবং তাদের মধ্যে বেশ কয়েকজন ইতোমধ্যেই ইউক্রেনীয় রণক্ষেত্রে যুদ্ধ করতে ফিরে এসেছেন। ইউরোপীয় তিনটি গোয়েন্দা সংস্থার হাতে আসা কিছু গোপন নথির বরাতে মঙ্গলবার এই চাঞ্চল্যকর তথ্য সামনে এসেছে।
২০২২ সালে ইউক্রেনে রাশিয়ার পূর্ণমাত্রার সামরিক অভিযান শুরুর পর থেকে দুই দেশ বেশ কয়েকটি যৌথ সামরিক মহড়া দিলেও, চীন সবসময় নিজেকে এই দ্বন্দ্বে নিরপেক্ষ এবং শান্তি মধ্যস্থতাকারী হিসেবে দাবি করে আসছিল। তবে এই নতুন তথ্য ইঙ্গিত করছে যে চীন এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি প্রত্যক্ষভাবে ইউরোপের এই যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ছে।
রয়টার্সের পর্যালোচনা করা একটি রুশ-চীনা দ্বিপাক্ষিক চুক্তিপত্র অনুযায়ী, ২০১৫ সালের জুলাই মাসে বেইজিংয়ে দুই দেশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের মধ্যে এই প্রশিক্ষণ চুক্তি সই হয়। চুক্তিতে বেইজিং এবং পূর্বাঞ্চলীয় শহর নানজিং সহ বিভিন্ন সামরিক ঘাঁটিতে প্রায় ২০০ রুশ সেনাকে ড্রোনের ব্যবহার, ড্রোন বিধ্বংসী ব্যবস্থা, ইলেকট্রনিক ওয়ারফেয়ার এবং সাঁজোয়া পদাতিক বাহিনীর ওপর বিশেষ কৌশলগত প্রশিক্ষণ দেওয়ার কথা উল্লেখ রয়েছে। বিনিময়ে শত শত চীনা সেনারও রাশিয়ার সামরিক ঘাঁটিতে প্রশিক্ষণ নেওয়ার কথা ছিল। এই সফরের বিষয়ে কোনো প্রকার গণমাধ্যম প্রচার বা তৃতীয় কোনো পক্ষকে তথ্য না জানানোর জন্য চুক্তিতে কঠোর নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছিল।
ইউরোপীয় গোয়েন্দা কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ইউক্রেন যুদ্ধে ড্রোন একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার হয়ে উঠেছে। রাশিয়া রণক্ষেত্রে দীর্ঘ অভিজ্ঞতাসম্পন্ন হলেও, ড্রোন প্রযুক্তিতে চীনের বিশাল প্রযুক্তিগত জ্ঞান এবং উন্নত ফ্লাইট সিমুলেটর প্রশিক্ষণ পদ্ধতি রুশ সেনাদের নতুন কৌশল শিখতে বড় সাহায্য করেছে।
চীনে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত রুশ সেনাদের একটি বড় অংশই ছিলেন উচ্চপদস্থ সামরিক প্রশিক্ষক, যারা দেশে ফিরে অন্য সেনাদের এই জ্ঞান ছড়িয়ে দিতে সক্ষম। ইতোমধ্যেই ডনবাস ও জাপোরিঝিয়ার মতো অধিকৃত ইউক্রেনীয় অঞ্চলে ড্রোনের সাহায্যে প্রত্যক্ষ যুদ্ধ পরিচালনায় অংশ নেওয়া বেশ কয়েকজন রুশ কর্মকর্তার পরিচয়ও নিশ্চিত করেছে একটি গোয়েন্দা সংস্থা, যাদের পদমর্যাদা জুনিয়র সার্জেন্ট থেকে লেফটেন্যান্ট কর্নেল পর্যন্ত।
রয়টার্সের হাতে আসা অভ্যন্তরীণ রুশ সামরিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রশিক্ষণ সেশনগুলোর মধ্যে ৮২ মিলিমিটার মর্টার নিক্ষেপের পাশাপাশি লক্ষ্যবস্তু শনাক্তকরণের জন্য ড্রোনের ব্যবহার, ইলেকট্রনিক ওয়ারফেয়ার রাইফেল দিয়ে শত্রু ড্রোন ভূপাতিত করা এবং নেট ছুড়ে ড্রোন আটকানোর মতো আধুনিক যুদ্ধের কৌশল অন্তর্ভুক্ত ছিল। এ ছাড়া নানজিংয়ের মিলিটারি ইঞ্জিনিয়ারিং ইউনিভার্সিটিতে রুশ সেনাদের মাইন স্থাপন ও তা নিষ্ক্রিয়করণের ওপরও বাস্তবমুখী শিক্ষা দেওয়া হয়, যার কিছু ছবিও সামনে এসেছে।
যদিও এই খবরের বিষয়ে রাশিয়া ও চীনের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় কোনো মন্তব্য করেনি, তবে চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, ইউক্রেন সংকটে বেইজিং সবসময় একটি নিরপেক্ষ অবস্থান বজায় রেখেছে এবং বিশ্ব সম্প্রদায় এর সাক্ষী।
বেইজিংয়ের দাবি, সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর উচিত নয় উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে এই বিরোধকে উসকে দেওয়া বা অন্যের ওপর দোষ চাপানো। এমন এক সময়ে এই গোপন প্রশিক্ষণের খবর সামনে এলো, যখন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাম্প্রতিক হাই-প্রোফাইল সফরের সপ্তাহ পার হতেই বেইজিংয়ে দুই দিনের সফরে চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সাথে বৈঠকে বসতে যাচ্ছেন রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন।
পশ্চিমা বিশ্ব যখন মস্কোকে একঘরে করার চেষ্টা করছে, তখন চীন রাশিয়ার তেল ও গ্যাস কিনে তাদের অর্থনৈতিক লাইফলাইন সচল রাখার পাশাপাশি সামরিক সহযোগিতাও বাড়িয়ে চলেছে, যা ইউরোপীয় শক্তিগুলোর জন্য গভীর উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।