প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাম্প্রতিক চীন সফরে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য বড় কোনো সাফল্য আসেনি। তবে গত বছরের তীব্র বাণিজ্যযুদ্ধের পর ওয়াশিংটন-বেইজিং সম্পর্কে আগের মতো প্রতিযোগিতামূলক কিন্তু স্থিতিশীল সম্পর্কে ফিরেছে।
রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুসারে, চীনের প্রেসিডেন্ট নেতা শি জিনপিংয়ের সঙ্গে ট্রাম্পের দুই দিনের আলোচনায় কিছু বিষয় স্পষ্ট হয়েছে। ট্রাম্প ঘোষিত ‘লিবারেশন ডে’ শুল্ক এবং গত বছরের শেষদিকে হওয়া বাণিজ্য সমঝোতার পরও ওয়াশিংটন ও বেইজিং এখনো প্রতিদ্বন্দ্বিতার মধ্যেই আটকে রয়েছে। হোয়াইট হাউজে ট্রাম্প দ্বিতীয় মেয়াদ শুরু করার সময় উত্তরাধিকারসূত্রে চীনের প্রতিযোগিতামূলক সম্পর্ক পেয়েছিলেন, সেটিই এখনো বহাল আছে।
যুক্তরাষ্ট্রের জন্য এর অর্থ হলো, কথিত বাণিজ্যিক সুবিধাবাদী নীতি থেকে শুরু করে ইন্দো-প্যাসিফিকে সামরিক প্রভাব বাড়ানোর চেষ্টা করবে চীন। অর্থাৎ দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিকগুলো এখনো অমীমাংসিত রয়ে গেছে।
অন্যদিকে শির জন্য পরিস্থিতিটি কিছুটা স্বস্তির সুযোগ এনে দিয়েছে। তিনি ফের তুলনামূলকভাবে পূর্বাভাসযোগ্য চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়েছেন। দুই দেশের সম্পর্কের জন্য তিনি ‘গঠনমূলক কৌশলগত স্থিতিশীলতা’ নামে একটি নতুন কাঠামোর কথাও তুলে ধরেন।
ওয়াশিংটনের সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের চীনবিশেষজ্ঞ স্কট কেনেডির মতে, ২০২৫ সালের শুরুর দিকে ট্রাম্প প্রশাসনের আক্রমণাত্মক বাণিজ্যনীতির তুলনায় শেষ পর্যন্ত সুবিধাজনক অবস্থানে এসেছে চীন।
তিনি বলেন, ‘এক বছর আগে যেখানে ১৪৫ শতাংশ শুল্ক ছিল এবং চীনসহ পুরো বিশ্বকে মৌলিক পরিবর্তনে বাধ্য করার চেষ্টা করছিল যুক্তরাষ্ট্র, সেখান থেকে এখন আমরা এক ধরনের বিপরীতমুখী পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে আবার স্থিতিশীলতায় ফিরে এসেছি।’
গত বৃহস্পতিবার ও শুক্রবারের শীর্ষ বৈঠকে ট্রাম্পের সঙ্গে ছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষ করপোরেট নির্বাহীরা। যেমন টেসলার ইলন মাস্ক এবং এনভিডিয়ার জেনসেন হুয়াং। তবে জাঁকজমকপূর্ণ নৈশভোজ ছাড়া সফর থেকে বেশিরভাগেরই দৃশ্যমান অর্জন খুব কম ছিল।
এ বৈঠকে ইরানের যুদ্ধ বন্ধে যুক্তরাষ্ট্রকে সহায়তার বিষয়ে চীনের কোনো প্রকাশ্য অঙ্গীকারও পাওয়া যায়নি। মধ্যপ্রাচ্যের এ সংঘাত বিশ্ববাজারে অস্থিরতা তৈরি করেছে এবং ট্রাম্পের জনপ্রিয়তায়ও প্রভাব ফেলেছে।
ওয়াশিংটনের ফাউন্ডেশন ফর ডিফেন্স অব ডেমোক্রেসিসের চীনবিশেষজ্ঞ ক্রেইগ সিঙ্গেলটন বলেন, ‘এই শীর্ষ বৈঠক স্থিতিশীলতার বার্তা দিয়েছে, কিন্তু অচলাবস্থা ভাঙতে পারেনি। বর্তমান পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্র-চীন সম্পর্ক যতটা বহন করতে পারে, এটি মূলত ততটাই—সীমিত, সাফল্য হিসেবে প্রচারযোগ্য ও নিয়ন্ত্রিত ফলাফল।’
অবশ্য হোয়াইট হাউজের এক কর্মকর্তা বলেছেন, ‘প্রেসিডেন্ট শির সঙ্গে ইতিবাচক সম্পর্ক কাজে লাগিয়ে মার্কিন জনগণের জন্য বাস্তব ফল বয়ে এনেছেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প।’
তিনি বোয়িংয়ের উড়োজাহাজ বিক্রি ও কৃষিপণ্য চুক্তির কথা উল্লেখ করেন, যা মার্কিন রফতানি বাড়াবে বলে দাবি করা হয়।
ওয়াশিংটনে চীনা দূতাবাসের এক মুখপাত্র বৈঠককে ‘খোলামেলা, গভীর, গঠনমূলক ও কৌশলগত’ বলে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, দুই দেশ কীভাবে সঠিকভাবে সহাবস্থান করতে পারে, তা নিয়েও আলোচনা হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, গত বছরের বাণিজ্যযুদ্ধের সময় ট্রাম্প চীনকে একতরফা ছাড় দিতে বাধ্য করতে শুল্কের ক্ষমতাকে অতিমূল্যায়ন করেছিলেন। পাল্টা হিসেবে বেইজিংও শুল্ক বাড়ায় এবং যুক্তরাষ্ট্রের শিল্পখাতে প্রয়োজনীয় গুরুত্বপূর্ণ খনিজ রফতানি সীমিত করার হুমকি দেয়। ফলে দুই পক্ষই এক ধরনের অস্বস্তিকর অচলাবস্থায় পড়ে।
এরপর থেকে হোয়াইট হাউজ চীনের বড় ব্যাংকগুলোর ওপর নিষেধাজ্ঞার মতো আর্থিক ও প্রযুক্তিগত চাপ প্রয়োগে অনীহা দেখিয়ে এসেছে। কারণ এতে অর্থনৈতিক ক্ষতির ঝুঁকি ছিল।
শি-ট্রাম্প বৈঠকে যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের অনেক দাবির কথাও প্রকাশ্যে খুব একটা ওঠেনি। এর মধ্যে রয়েছে শিল্পখাতে অতিরিক্ত উৎপাদন ক্ষমতা কমানোর দাবি। বাণিজ্য অংশীদারদের অভিযোগ রয়েছে, কমদামে পণ্য রফতানি করে বৈশ্বিক বাজার প্লাবিত করছে চীনে।
ভঙ্গুর এ বাণিজ্যযুদ্ধ বিরতিতে চীনও সন্তুষ্ট বলেই মনে হচ্ছে। কারণ দেশটি বর্তমানে দুর্বল অভ্যন্তরীণ অর্থনীতি সামাল দেয়ার পাশাপাশি এমন প্রযুক্তিগত সক্ষমতা গড়ে তুলতে চায়, যা দীর্ঘমেয়াদে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় তাকে এগিয়ে দেবে।
শীর্ষ বৈঠকের আগেই ট্রাম্প প্রশাসনের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তারা বড় ধরনের ফলাফলের পাওয়ার প্রত্যাশায় লাগাম টেনিছিলেন। তাদের মতে, দক্ষিণ কোরিয়ায় গত অক্টোবরে হওয়া আলোচনার পর যে বাণিজ্যযুদ্ধ বিরতি হয়েছিল এবং যার মেয়াদ শেষ হতে আর পাঁচ মাস বাকি, সেটি বাড়ানোর জন্য কোনো তাড়াহুড়ো নেই।
বাণিজ্য আলোচনার সঙ্গে পরিচিত এক সূত্র রয়টার্সকে জানায়, ট্রাম্প প্রশাসন যতদিনের জন্য বাণিজ্যযুদ্ধে বিরতি বাড়াতে রাজি ছিল, চীন তার চেয়ে বেশি সময় চেয়েছিল। পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রে আমদানীকৃত কিছু পণ্যের ওপর পুনরায় শুল্ক আরোপ করতে পারে—এমন তদন্ত নিয়েও বেইজিং আশ্বাস চেয়েছিল। এসব শুল্ক চলতি বছর মার্কিন সুপ্রিম কোর্ট বাতিল করেছে।
সূত্রটি জানায়, সামগ্রিকভাবে কোনো পক্ষই শীর্ষ বৈঠকে বড় কিছু প্রস্তাব দেয়নি। কিছু বাণিজ্যিক চুক্তি হয়তো শরৎকালে চূড়ান্ত হতে পারে, যখন শি পাল্টা সফরে হোয়াইট হাউজে যাওয়ার কথা রয়েছে।