04/30/2026 রাজা চার্লসের যুক্তরাষ্ট্র সফরে চাঙ্গা হলো যুক্তরাজ্য-যুক্তরাষ্ট্রের টানাপোড়েনপূর্ণ সম্পর্ক
মুনা নিউজ ডেস্ক
২৯ এপ্রিল ২০২৬ ১৯:১৫
রাজপরিবারের একজন প্রাক্তন ঘনিষ্ঠ ব্যক্তি বলেছেন, রাজার যুক্তরাষ্ট্র সফর লন্ডন ও ওয়াশিংটনের মধ্যকার সম্পর্কে ‘রিসেট বাটন’ চেপে দিয়েছে। এলসা অ্যান্ডারসন ২০০১ থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত রানী দ্বিতীয় এলিজাবেথের যোগাযোগ ও প্রেস সচিব ছিলেন।
তিনি বলেন, ‘চার্লস এই বড় বড় ভাষণগুলো দিতে এখন আরো বেশি আত্মবিশ্বাসী বোধ করছেন।’ তিনি আরো বলেন, ‘যদিও তিনি একজন রাষ্ট্রপ্রধান, কোনো দলীয় রাজনীতির ব্যক্তি নন।
তবে তিনিই একমাত্র ব্যক্তি, যিনি গত দুই দিনে আমেরিকান জনগণের জন্য সত্যিই অসাধারণ বিশেষ কিছু উপহার দিতে পেরেছেন।’
যুক্তরাষ্ট্রে সফররত ব্রিটিশ রাজা তৃতীয় চার্লস গতকাল মঙ্গলবার যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসে ভাষণ দিয়েছেন। ১৯৯১ সালে রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথের পর প্রথম কোনো ব্রিটিশ রাজা বা রানি হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসে ভাষণ দেওয়ার ঘটনা। ভাষণ দিতে গিয়ে মা প্রয়াত রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথের কথা স্মরণ করে তিনি বলেন, আমার মা একই কক্ষে ভাষণ দিয়েছিলেন।
যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রীয় সফরে রাজা তৃতীয় চালর্সের সফরকে একদিকে যেমন উদযাপন হিসেবে দেখা হচ্ছে, অন্যদিকে এটিকে দুই দেশের সম্পর্ক মেরামতের একটি কূটনৈতিক উদ্যোগ হিসেবেও ব্যাখ্যা করা হচ্ছে।
এই সফর উপলক্ষে যুক্তরাষ্ট্রের ২৫০তম বার্ষিকী এবং দীর্ঘদিনের অ্যাংলো-আমেরিকান সম্পর্ককে সামনে আনা হয়েছে। তবে বর্তমানে ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের সময় যুক্তরাষ্ট্র–যুক্তরাজ্য সম্পর্ক কিছুটা টানাপোড়েনে রয়েছে, বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্য ইস্যুতে নীতিগত মতভেদের কারণে।
বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ইরানবিরোধী নীতিতে ব্রিটেনের পূর্ণ সমর্থন না দেওয়াকে কেন্দ্র করেই এই দূরত্ব তৈরি হয়েছে।
এমন পরিস্থিতিতে রাজা চার্লসের এই সফরকে দুই দেশের শীতল আবস্থা কাটানোর প্রচেষ্টা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
রাজা চার্লস তার কংগ্রেস ভাষণে দুই দেশের দীর্ঘ ঐতিহাসিক সম্পর্কের ওপর জোর দেন। পরে হোয়াইট হাউসের রাষ্ট্রীয় নৈশভোজেও তিনি একই বার্তা দেন।
অন্যদিকে, ট্রাম্প রাজার প্রশংসা করে বলেন, ‘তিনি একজন অসাধারণ ব্যক্তি… এটি সত্যিই একটি সম্মানের বিষয়।’ তবে ভাষণে কিছু মন্তব্য এমন ছিল, যা ডেমোক্র্যাটদের মধ্যে উৎসাহ তৈরি করেছে এবং হোয়াইট হাউসে কিছুটা অস্বস্তিও সৃষ্টি করেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
রাজা তৃতীয় চালর্স তার ভাষণের শুরুতেই স্বীকার করেন, যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্য বর্তমানে ‘গভীর অনিশ্চয়তার সময়’ পার করছে। তিনি বলেন, মধ্যপ্রাচ্য ও ইউরোপের চলমান সংঘাত দুই দেশের জন্যই নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। একই সঙ্গে রাজনৈতিক সহিংসতা গণতন্ত্রের জন্য হুমকি হয়ে উঠছে বলেও তিনি সতর্ক করেন।
তিনি যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের অতীত সম্পর্কের ভিন্নমত নিয়েও কথা বলেন। তিনি বলেন, ‘১৭৭৬ সালের চেতনা মাথায় রেখে আমরা হয়তো একমত হতে পারি, কারণ আমরা সবসময় একমত হতে পারি না।’ তবে এই কথার মাধ্যমে তিনি মূলত দুই দেশের মাঝে মতপার্থক্য থাকলেও সহযোগিতার গুরুত্ব তুলে ধরেন।
ভাষণের শেষ অংশে রাজা চার্লস জোর দিয়ে বলেন, যখন যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্য একসঙ্গে কাজ করে, তখন তারা শুধু নিজেদের জনগণের জন্য নয়, বরং পুরো বিশ্বের জন্যই বড় কিছু অর্জন করতে পারে।
রাজা তার ভাষণে যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাহী ক্ষমতা ও গণতান্ত্রিক নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার ওপর একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দেন। তিনি বলেন, ‘চেকস অ্যান্ড ব্যালান্স’ বা ক্ষমতার ওপর নিয়ন্ত্রণ ও ভারসাম্যের ধারণা ব্রিটিশ আইনি ঐতিহ্য থেকে এসেছে, যা ম্যাগনা কার্টা থেকে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। এই নীতিই পরবর্তীতে যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধানের ভিত্তি গড়ে দিয়েছে।
তার এই বক্তব্য কংগ্রেসে দাঁড়িয়ে থাকা দর্শকদের কাছ থেকে জোরালো করতালিও পায়। তবে করতালির শুরু হয় মূলত ডেমোক্র্যাটদের দিক থেকে, পরে তা পুরো কক্ষে ছড়িয়ে পড়ে।
ভাষণের শেষ দিকে রাজা চার্লস বলেন, ‘আমেরিকার কথা অর্থবহ, যেমনটা স্বাধীনতার সময় থেকে ছিল। তবে এই মহান জাতির কাজ তার চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ।’ এই মন্তব্যে ডেমোক্র্যাটদের মধ্যে কিছু সমর্থন ও কিছু উদ্বেগ দেখা যায়। অনেকের মতে, রাজা চার্লসের এই বক্তব্য শুধু প্রশংসা নয়, বরং যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক ব্যবস্থার প্রতি একটি পরোক্ষ সতর্কবার্তাও ছিল।
রাজা তৃতীয় চালর্স ভাষণে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের দীর্ঘদিনের নিরাপত্তা জোট ন্যাটো ও আটলান্টিক অংশীদারিত্বের গুরুত্ব তুলে ধরেন। তিনি সাবেক যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হেনরি কিসিঞ্জারকে উদ্ধৃত করে বলেন, আটলান্টিক জোট দুই মহাদেশের মধ্যে ঐতিহাসিক সহযোগিতার প্রতীক। তিনি উল্লেখ করেন, ৯/১১ হামলার পরই প্রথমবারের মতো ন্যাটো সদস্যদের রক্ষায় সামরিকভাবে সক্রিয় হয়েছিল।
এই বক্তব্য এমন সময় আসে, যখন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ব্রিটিশ নৌবাহিনীকে একসময় সমালোচনা করে তাদের জাহাজকে ‘খেলনা’ এবং কিছু বিমানবাহী রণতরীকে ‘অকার্যকর’ বলেছিলেন। এর বিপরীতে রাজা চার্লস নিজের রয়েল নেভির পাঁচ বছরের অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরে নিরাপত্তা ও গোয়েন্দা সহযোগিতার গুরুত্ব বোঝান।
তিনি বলেন, আটলান্টিকের গভীরতা থেকে শুরু করে আর্কটিকের দ্রুত গলতে থাকা বরফ পর্যন্ত, যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের সামরিক শক্তি ন্যাটোর মূল ভিত্তি। এটি জনগণকে সুরক্ষা দেয় এবং যৌথ শত্রুদের বিরুদ্ধে প্রতিরক্ষা নিশ্চিত করে। এ বক্তব্যের মাধ্যমে তিনি যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের মধ্যে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা আরো শক্তিশালী করার আহ্বান জানান, পাশাপাশি পরিবেশগত পরিবর্তনের মতো বৈশ্বিক সমস্যার কথাও স্মরণ করিয়ে দেন।
রাজা যুক্তরাষ্ট্র সফরের ভাষণে বিতর্কিত যৌন অপরাধী জেফরি এপস্টিনের প্রসঙ্গ সরাসরি এড়িয়ে গেছেন। ভাষণে অনেকেই আশা করেছিলেন তিনি এপস্টিনের ভুক্তভোগীদের বিষয়ে সরাসরি কিছু বলবেন বা তাদের সঙ্গে দেখা করবেন, কিন্তু তিনি তা করেননি। তবে তিনি পরোক্ষভাবে একটি মন্তব্য করেন, যেখানে তিনি দুই দেশের সমাজে বিদ্যমান বিভিন্ন অসঙ্গতি ও ক্ষতি থেকে ভুক্তভোগীদের সহায়তার প্রয়োজনীয়তার কথা বলেন।
এর আগে যুক্তরাষ্ট্র কংগ্রেস এপস্টেইন তদন্ত সংক্রান্ত সরকারি নথি প্রকাশের নির্দেশ দেয়। এসব নথি প্রকাশের পর এপস্টিনের প্রভাবশালী ব্যক্তিদের সঙ্গে সম্পর্ক নিয়ে নতুন তথ্য সামনে আসে। সেখানে যুক্ত হয়েছে যুক্তরাজ্যের সাবেক রাষ্ট্রদূত পিটার ম্যান্ডেলসন এবং রাজার ভাই প্রিন্স অ্যান্ড্রুর নামও।
বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের তুলনায় যুক্তরাজ্যেই এই কেলেঙ্কারির রাজনৈতিক প্রভাব বেশি পড়েছে। তবে এখনো বিষয়টি আন্তর্জাতিকভাবে আলোচনায় রয়েছে এবং অনেকেই মনে করছেন, পুরো সত্য সামনে আসতে আরো সময় লাগতে পারে।
ভাষণে যুক্তরাষ্ট্র–যুক্তরাজ্য সম্পর্কের ভবিষ্যৎকে সামনে রেখে কিছুটা গম্ভীর উদ্দেশ্য থাকলেও চালর্স পুরো বক্তব্যে হালকা রসিকতার সুর বজায় রাখেন। তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইংল্যান্ডের মধ্যে প্রায় সবকিছুই মিল আছে, শুধু একটি জিনিস ছাড়া, সেটি হলো ভাষা।
বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের মধ্যে সাম্প্রতিক কিছু রাজনৈতিক টানাপোড়েন থাকলেও এই ধরনের রসিকতা ও সৌজন্যমূলক বক্তব্যের মাধ্যমে রাজা চার্লস দুই দেশের সম্পর্কের বরফ গলানোর চেষ্টা করেছেন এবং পরিবেশকে আরো স্বাভাবিক করেছেন। তবে রাজার যুক্তরাষ্ট্র সফরকে অনেক বিশ্লেষক সফল কূটনৈতিক সফর হিসেবে দেখলেও, পুরো সফরটি একেবারে বিতর্কমুক্ত ছিল না।
সফরের শুরুতেই যুক্তরাষ্ট্রে ব্রিটিশ রাষ্ট্রদূত ক্রিশ্চিয়ান টার্নারের একটি ফাঁস হওয়া মন্তব্য নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়। সেখানে তিনি বলেছিলেন, যুক্তরাষ্ট্রের ‘বিশেষ সম্পর্ক’ আসলে সম্ভবত ইসরায়েলের সঙ্গেই বেশি ঘনিষ্ঠ। এমন মন্তব্য সামনে আসায় কূটনৈতিক অস্বস্তি তৈরি হয়। ব্রিটিশ পররাষ্ট্র দপ্তর জানায়, ওই মন্তব্য ছিল ব্যক্তিগত ও অনানুষ্ঠানিক এবং এটি সরকারের অবস্থান নয়।
এরপর হোয়াইট হাউসে আয়োজিত নৈশভোজে মধ্যপ্রাচ্য পরিস্থিতি আবার আলোচনায় আসে। ট্রাম্প দাবি করেন, ইরান ইস্যুতে রাজা চার্লস তার নীতিকে সমর্থন করেন, যা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের মধ্যে আগেই টানাপোড়েন তৈরি হয়েছে। তবে রাজপ্রাসাদ স্পষ্ট করে জানায়, রাজা চার্লস শুধু সরকারের দীর্ঘদিনের নীতি অনুযায়ী ইরান বিষয়ে আলোচনা করেছেন, ব্যক্তিগত কোনো অবস্থান জানাননি। এ ছাড়া ন্যাটো জোট নিয়ে রাজা চার্লসের মন্তব্যও আলোচনায় আসে।
অন্যদিকে ট্রাম্প দীর্ঘদিন ধরেই ন্যাটো নিয়ে সমালোচনামূলক অবস্থান নিয়েছেন, আবারও জোটের সদস্য দেশগুলোর সমর্থন নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। বিশ্লেষকদের মতে, সফরে সৌহার্দ্যপূর্ণ পরিবেশ থাকলেও বিভিন্ন মন্তব্য ও ইস্যু যুক্তরাষ্ট্র–যুক্তরাজ্য সম্পর্কের ভেতরের কূটনৈতিক সংবেদনশীলতাগুলো সামনে এনে দিয়েছে।
A Publication of MUNA National Communication, Media & Cultural Department. 1033 Glenmore Ave, Brooklyn, NY 11208, United States.