04/29/2026 ‘ওপেক’ থেকে বেরিয়ে এলো আরব আমিরাত
মুনা নিউজ ডেস্ক
২৮ এপ্রিল ২০২৬ ২৩:৫৩
পেট্রোলিয়াম রফতানিকারক দেশগুলোর শক্তিশালী জোট ‘ওপেক’ (OPEC) থেকে সংযুক্ত আরব আমিরাতের সদস্যপদ প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত বিশ্বজ্বালানি রাজনীতির প্রেক্ষাপট আমূল বদলে দিয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর সম্মিলিতভাবে তেলের দাম কৃত্রিমভাবে চড়া রাখার যে একচেটিয়া ক্ষমতা ছিল, এই বিচ্ছেদের ফলে তাতে বড় ধরনের ফাটল ধরল।
আমিরাতের এই সাহসী পদক্ষেপ একদিকে যেমন বৈশ্বিক বাজারে তেলের দাম নিয়ন্ত্রণে নতুন প্রতিযোগিতা তৈরি করবে, অন্যদিকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানি নিরাপত্তা ও অভ্যন্তরীণ তেল উৎপাদকদের জন্য দীর্ঘমেয়াদি চ্যালেঞ্জ এবং জটিলতা সৃষ্টি করতে পারে।
জ্বালানি আমদানির ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান অবস্থান বেশ কৌতূহলোদ্দীপক। দেশটি বর্তমানে প্রায় জ্বালানি স্বনির্ভর হলেও তাদের ব্যবহারের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ তেল বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয়। এর মূল কারণ হলো আমেরিকার নিজস্ব খনি থেকে উত্তোলিত ‘লাইট সুইট ক্রুড’ গ্যাসোলিন তৈরির জন্য চমৎকার হলেও ভারী জ্বালানি বা অন্যান্য পেট্রোলিয়ামজাত পণ্য তৈরির জন্য খুব একটা কার্যকর নয়। ফলে ভারী তেলের প্রয়োজনে যুক্তরাষ্ট্রকে এখনো মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর ওপর উল্লেখযোগ্যভাবে নির্ভর করতে হয়। আমিরাতের সরে যাওয়া এই সরবরাহব্যবস্থায় বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে।
দীর্ঘমেয়াদি দৃষ্টিকোণ থেকে ওপেকের ক্ষমতা হ্রাস পাওয়া সাধারণ ভোক্তাদের জন্য আশাব্যঞ্জক হতে পারে। সংযুক্ত আরব আমিরাত এই অঞ্চলের দ্বিতীয় বৃহত্তম তেল উৎপাদনকারী দেশ। এখন থেকে ওপেকের কোটা বা উৎপাদন হ্রাসের কঠোর বিধিনিষেধ ছাড়াই আমিরাত স্বাধীনভাবে বাজারে তেল সরবরাহ করতে পারবে। বাজারে বড় পরিমাণের নতুন তেলের জোগান একটি প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশ তৈরি করবে, যা বিশ্বব্যাপী জ্বালানি তেলের দাম কমিয়ে আনার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। এর ফলে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় কিছুটা কমলেও মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে এটি হবে একটি বড় সহায়ক শক্তি।
তবে মার্কিন অভ্যন্তরীণ তেল উৎপাদকদের জন্য এই খবর খুব একটা সুখকর নাও হতে পারে। বিশ্ববাজারে তেলের অতিরিক্ত জোগান দামের ওপর নিম্নমুখী চাপ তৈরি করবে, যা সরাসরি আমেরিকার বড় বড় তেল কোম্পানিগুলোর মুনাফায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। ইরান যুদ্ধের আগে থেকেই বিশ্ববাজারে তেলের সরবরাহ চাহিদার তুলনায় বেশি ছিল। এখন ওপেকের নিয়ন্ত্রণমুক্ত হয়ে আমিরাত যদি উৎপাদন বাড়িয়ে দেয়, তবে বিশ্ববাজারে তেলের দরপতন অনিবার্য। এমন পরিস্থিতিতে মার্কিন উৎপাদকরা লোকসান এড়াতে ভবিষ্যতে তাদের উৎপাদন কমিয়ে দিতে বাধ্য হতে পারেন, যা দেশটির দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি কৌশলে বড় ধরনের বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করতে পারে।
আঞ্চলিক নিরাপত্তার প্রেক্ষাপটেও এই বিচ্ছেদ নতুন উদ্বেগের জন্ম দিচ্ছে। ওপেকের মতো একটি সুসংগঠিত জোট যখন ভেঙে যায় বা গুরুত্বপূর্ণ সদস্যরা চলে যায়, তখন ভবিষ্যতে যেকোনো জরুরি পরিস্থিতি বা জ্বালানিসংকটে সমন্বিত সাড়া দেওয়ার ক্ষমতা কমে যায়। মধ্যপ্রাচ্যের অস্থির রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে আমিরাতের এই একক সিদ্ধান্ত জোটের একতাকে দুর্বল করে দিয়েছে। এই বিভাজন দীর্ঘকালীন সংকটের সময় আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে দেশগুলোর সক্ষমতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে, যার নেতিবাচক প্রভাব সরাসরি পশ্চিমা দেশগুলোর ওপর পড়তে পারে।
পরিশেষে বলা যায়, আরব আমিরাতের এই সিদ্ধান্ত কেবল একটি জোট ত্যাগের বিষয় নয়; এটি মূলত ইরান যুদ্ধ পরবর্তী বিশ্বব্যবস্থায় স্থায়ী পরিবর্তনের একটি বহিঃপ্রকাশ। এই যুদ্ধের ফলে বৈশ্বিক সরবরাহ চেইন বা সাপ্লাই চেইনগুলো নতুন করে বিন্যস্ত হচ্ছে এবং বাণিজ্যের প্রচলিত নিয়মগুলো বদলে যাচ্ছে। আমিরাতের এই পথ অনুসরণ করে ভবিষ্যতে হয়তো আরও অনেক দেশই নিজেদের স্বার্থে ওপেকের বাইরে আসার সিদ্ধান্ত নিতে পারে।
বিশ্ব অর্থনীতিতে এই পরিবর্তনের যে হাওয়া শুরু হয়েছে, তার প্রভাব সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনের ব্যয় থেকে শুরু করে আন্তর্জাতিক কূটনীতি পর্যন্ত সর্বত্র ছড়িয়ে পড়বে।
A Publication of MUNA National Communication, Media & Cultural Department. 1033 Glenmore Ave, Brooklyn, NY 11208, United States.