04/22/2026 মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনায় বিঘ্নিত বাংলাদেশের সামুদ্রিক বাণিজ্য
মুনা নিউজ ডেস্ক
২২ এপ্রিল ২০২৬ ০০:৫৪
মধ্যপ্রাচ্যের উত্তপ্ত ভূরাজনীতির ছায়া এবার এসে পড়েছে বাংলাদেশের সামুদ্রিক বাণিজ্যে। বিশ্বের ব্যস্ততম নৌপথ হরমুজ প্রণালি-এ ইরানের কড়াকড়িতে আমদানিনির্ভর দেশগুলোতে প্রভাব পড়তে শুরু করেছে। বাংলাদেশেও পড়ছে এর প্রভাব। কঠোর নিয়ন্ত্রণের কারণে আটকে আছে বাংলাদেশি জাহাজ ‘বাংলার জয়যাত্রা।’
ইসলামিক বিপ্লবী গার্ড কোর (আইআরজিসি)-এর অনুমতি না পাওয়ায় প্রণালিটি অতিক্রম করতে পারছে না জাহাজটি। কূটনৈতিক অস্বস্তি, নিরাপত্তা হিসাব-নিকাশ এবং আঞ্চলিক সংঘাত—সব মিলিয়ে জাহাজটির যাত্রা এখন অনিশ্চয়তার মধ্যে ঝুলে আছে।
দুই দফা ব্যর্থ চেষ্টা, অনিশ্চয়তায় ‘বাংলার জয়যাত্রা’
প্রায় ৩৭ হাজার টন সারবোঝাই ‘বাংলার জয়যাত্রা’ দুই দফা চেষ্টা করেও হরমুজ প্রণালি পার হতে পারেনি।
বর্তমানে এটি সংযুক্ত আরব আমিরাতের একটি বন্দরের কাছাকাছি অপেক্ষমাণ অবস্থায় রয়েছে।
বাংলাদেশ শিপিং করপোরেশনের (বিএসসি) মালিকানাধীন এই জাহাজটি সিঙ্গাপুরভিত্তিক একটি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে পরিচালিত হলেও এর নাবিকরা সবাই বাংলাদেশি। জাহাজটির নির্ধারিত গন্তব্য ছিল দক্ষিণ আফ্রিকার কেপটাউন ও ডারবান বন্দর।
বিএসসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক কমোডর মাহমুদুল মালেক জানিয়েছেন, জাহাজটিকে হরমুজ পার করানোর জন্য ইরানের অনুমোদন পেতে কূটনৈতিক চ্যানেলে জোর তৎপরতা চলছে।
ইরানের কাছে অনুরোধেও মিলছে না সাড়া
এই জটিল পরিস্থিতি নিরসনে কূটনৈতিক তৎপরতা জোরদার করেছে ঢাকা। তুরস্কে এক বৈঠকে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান ইরানের উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী সাঈদ খাতিবজাদহের কাছে জাহাজটির নিরাপদ যাত্রা নিশ্চিত করতে সরাসরি সহায়তা চান।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বলছেন, বিষয়টি এখন উচ্চ পর্যায়ের কূটনৈতিক আলোচনার অংশ হয়ে উঠেছে এবং দ্রুত সমাধানের জন্য একাধিক চ্যানেলে যোগাযোগ অব্যাহত রয়েছে।
একাধিক জাহাজের চলাচল ব্যাহত
এই সংকট কেবল একটি জাহাজে সীমাবদ্ধ নয়। ক্যামেন আইল্যান্ডের পতাকাবাহী আরেকটি জাহাজ, যা সৌদি আরবের জুয়াইমাহ টার্মিনাল থেকে অ্যারাবিয়ান লাইট ক্রুড ওয়েল নিয়ে চট্টগ্রামে আসার কথা ছিল, সেটিও ইরানের অনুমতি না পাওয়ায় যাত্রা শুরু করতে পারেনি।
যদিও ইরানের রাষ্ট্রদূত আশ্বাস দিয়েছিলেন যে, বাংলাদেশসহ কয়েকটি দেশের জ্বালানিবাহী জাহাজ হরমুজ প্রণালি অতিক্রম করতে পারবে। একই ধরনের ইঙ্গিত দিয়েছিলেন ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি।
এই বাস্তবতার সঙ্গে ঘোষণার অসামঞ্জস্য নতুন করে প্রশ্ন তুলছে-ইরানের অবস্থান কি পরিবর্তিত হয়েছে?
ঘটনার পেছনে কূটনৈতিক অসন্তোষ?
ঢাকার কূটনৈতিক মহলে জোরালোভাবে যে ব্যাখ্যাটি আলোচিত হচ্ছে তা হলো-ইরানে হামলা এবং আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির মৃত্যুর পর বাংলাদেশের প্রতিক্রিয়া তেহরানকে সন্তুষ্ট করতে পারেনি।
প্রথম বিবৃতিতে বাংলাদেশ ইরানের পাল্টা হামলার সমালোচনা করলেও যুক্তরাষ্ট্র বা ইসরায়েলের নাম উল্লেখ করেনি। এতে ইরানের দৃষ্টিতে বাংলাদেশের অবস্থান একপেশে বা অস্পষ্ট বলে প্রতীয়মান হয়।
পরবর্তীতে সংশোধিত বিবৃতিতে খামেনির মৃত্যুকে আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন বলা হলেও তা প্রাথমিক প্রতিক্রিয়ার ঘাটতি পূরণে যথেষ্ট ছিল না-এমনটাই মনে করছেন কূটনীতিকরা।
প্রকাশ্যেই অসন্তোষ জানায় তেহরান
ঢাকায় ইরানের রাষ্ট্রদূত জালিল রাহিমী জাহানাবাদী প্রকাশ্যে একাধিকবার বলেছেন, বাংলাদেশের অবস্থান স্পষ্ট নয় এবং এতে তেহরান সন্তুষ্ট নয়।
তিনি ইঙ্গিত দেন, বাংলাদেশ চাইলে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ইরানের ওপর হামলার নিন্দা জানাতে পারত। একইসঙ্গে ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরে যুদ্ধবিরোধী জনমতের উদাহরণ তুলে ধরে বাংলাদেশের কাছ থেকেও আরও দৃঢ় অবস্থান প্রত্যাশা করেন।
জালিল রাহিমী জাহানাবাদী বলেন, বাংলাদেশ জাতিসংঘ ও ওআইসির সদস্যরাষ্ট্র হিসেবে ইরানে আগ্রাসী শক্তির বিরুদ্ধে নিন্দা জানাতে পারত।
পররাষ্ট্রনীতির ভারসাম্য প্রশ্নে বিতর্ক
বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির মূল ভিত্তি হলো-যে কোনো দেশের ওপর আক্রমণের বিরোধিতা করা এবং সার্বভৌমত্বের প্রতি সম্মান দেখানো। কিন্তু এবার এটি সেভাবে হয়নি বলেই এমন অবস্থার মুখোমুখি হতে হয়েছে বলে জানিয়েছেন কূটনীতিকরা।
সাবেক কূটনীতিক হুমায়ুন কবির বলছেন, কোনো দেশে আক্রমণ বাংলাদেশ সমর্থন করে না- এই নীতিই বাংলাদেশ সবসময় অনুসরণ করে আসছিল কিন্তু এবার সেভাবে হয়নি বলেই হয়তো বিভ্রান্তির অবকাশ তৈরি হয়েছে।
তার বিশ্লেষণ অনুযায়ী, সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহে সেই নীতির প্রতিফলন যথেষ্ট স্পষ্ট না হওয়ায় আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বিভ্রান্তির সৃষ্টি হয়েছে, যার প্রভাব পড়ছে বাস্তব ক্ষেত্রেও-যেমন জাহাজ চলাচলে বাধা।
তিনি বলেন, পররাষ্ট্রনীতির একটা নৈতিক ভিত্তি থাকতে হয় এবং কোনো দেশ আক্রান্ত হোক বা আক্রমণের মুখে পড়লে সেটা বাংলাদেশ সমর্থন করে না।
এই কূটনীতিক আরও বলেন, বাংলাদেশের কোনো বিষয়ে অবস্থান প্রকাশের ক্ষেত্রে এ দুটো বিষয় মনে রাখা জরুরি। এর ব্যত্যয় হলেই বাংলাদেশের অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন উঠে। সব রাষ্ট্রেরই সার্বভৌমত্ব ও পারস্পারিক সম্মানকে গুরুত্ব দিতে হয়। এবার সেভাবে হয়নি বলেই হয়তো প্রশ্নটি উঠেছে।
নিরাপত্তা পরিস্থিতি ও যুদ্ধের প্রভাব
ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার পর ইরান পাল্টা পদক্ষেপ নেয়, যার ফলে পুরো উপসাগরীয় অঞ্চল অস্থিতিশীল হয়ে ওঠে।
এই পরিস্থিতিতে ইরান কৌশলগত ও নিরাপত্তাজনিত কারণে হরমুজ প্রণালিতে কঠোর নজরদারি ও নিয়ন্ত্রণ আরোপ করে। ফলে প্রতিটি জাহাজকে পৃথকভাবে যাচাই করে অনুমতি দেওয়া হচ্ছে-যা কার্যত আন্তর্জাতিক নৌ চলাচলকে ধীর করে দিয়েছে।
উত্তরণের পথ কতটা খোলা?
বর্তমানে কূটনৈতিক আলোচনার ওপরই নির্ভর করছে ‘বাংলার জয়যাত্রা’র ভাগ্য। দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের টানাপোড়েন কাটিয়ে উঠতে পারলে এবং পারস্পরিক আস্থার ঘাটতি দূর হলে দ্রুতই পরিস্থিতির উন্নতি হতে পারে বলেই মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বিএসসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক কমোডর মাহমুদুল মালেক বলছেন, যেভাবে সরকার কূটনৈতিক তৎপরতা চালাচ্ছে তাতে আমরা আশা করি দ্রুতই হরমুজ পার হতে জাহাজটি ইরানি কর্তৃপক্ষের অনুমতি পাবে।
তবে এই ঘটনা স্পষ্ট করে দিয়েছে-ভূরাজনৈতিক সংকটের প্রভাব কেবল যুদ্ধক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ থাকে না, বরং তা সরাসরি প্রভাব ফেলে বাণিজ্য, জ্বালানি সরবরাহ এবং কূটনৈতিক সম্পর্কের ওপরও।
A Publication of MUNA National Communication, Media & Cultural Department. 1033 Glenmore Ave, Brooklyn, NY 11208, United States.