03/31/2026 ইরানের হামলার বিরুদ্ধে স্পেনের প্রধানমন্ত্রী সানচেজের কঠোর অবস্থান
মুনা নিউজ ডেস্ক
৩১ মার্চ ২০২৬ ১৯:০২
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল কর্তৃক ইরানে হামলার ঘটনায় ইউরোপের অন্যান্য দেশ যখন দোটানায়, তখন স্পেনের প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ অত্যন্ত দৃঢ় ও স্পষ্ট অবস্থান নিয়ে বিশ্বমঞ্চে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে চলে এসেছেন। হামলার মাত্র কয়েক দিন পরই জাতির উদ্দেশে দেওয়া এক ভাষণে তিনি সরাসরি ‘যুদ্ধকে না’ বলে দিয়েছেন। সানচেজের এই সংক্ষিপ্ত শক্তিশালী বার্তাটি কেবল একটি রাজনৈতিক অবস্থান নয় বরং এর গভীরে মিশে আছে ২০০৩ সালের ইরাক যুদ্ধের তিক্ত ও যন্ত্রণাদায়ক স্মৃতি, যা আজও স্প্যানিশ জনমনে দগদগে।
প্রধানমন্ত্রী সানচেজ তার বক্তৃতায় সরাসরি উল্লেখ করেছেন, দুই দশক আগে ট্রাম্প প্রশাসন যেভাবে স্পেনকে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধে টেনে নিয়েছিল, সেই ভুলের পুনরাবৃত্তি তিনি আর হতে দেবেন না। তিনি মনে করেন, ইরাক যুদ্ধ ইউরোপের নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে চরম ঝুঁকির মুখে ফেলে দিয়েছিল এবং বর্তমান ইরান সংকট সেই দুঃস্বপ্নকেই আরও বড় পরিসরে ফিরিয়ে আনার হুমকি দিচ্ছে। এই ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটটিই সানচেজকে বর্তমান দ্বন্দ্বে ট্রাম্পের চাপের মুখেও মেরুদণ্ড সোজা করে দাঁড়ানোর শক্তি যুগিয়েছে।
সানচেজ কেবল কথার মাধ্যমেই তার বিরোধিতা সীমাবদ্ধ রাখেননি বরং বেশ কিছু সাহসী পদক্ষেপ গ্রহণ করেছেন। তিনি ইরানের ওপর হামলা পরিচালনাকারী আমেরিকান যুদ্ধবিমানগুলোর জন্য স্পেনের আকাশসীমা সম্পূর্ণ বন্ধ ঘোষণা করেছেন। এর পাশাপাশি স্পেনে অবস্থিত সামরিক ঘাঁটিগুলো এই যুদ্ধে ব্যবহারের অনুমতি দিতেও তিনি সাফ মানা করে দিয়েছেন। তার এই সিদ্ধান্ত প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে ক্ষুব্ধ করেছে, এমনকি ট্রাম্প স্পেনের সঙ্গে বাণিজ্য সম্পর্ক ছিন্ন করার হুমকি পর্যন্ত দিয়েছেন।
স্পেনের এই যুদ্ধবিরোধী অবস্থানের মূলে রয়েছে দেশটির বিশাল জনসমর্থন। সাম্প্রতিক জনমত জরিপ অনুযায়ী, স্পেনের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ মানুষ ইরানে এই সামরিক হস্তক্ষেপের বিপক্ষে। স্পেনের মানুষের কাছে ২০০৪ সালের মাদ্রিদ ট্রেন হামলার স্মৃতি আজও অম্লান, যা ইরাক ও আফগানিস্তান যুদ্ধে স্পেনের অংশগ্রহণের প্রতিশোধ হিসেবে চালানো হয়েছিল। সেই ভয়াবহ জঙ্গি হামলায় ১৯১ জন প্রাণ হারিয়েছিলেন, যা স্পেনের রাজনীতিতে আমূল পরিবর্তন এনেছিল এবং তৎকালীন রক্ষণশীল সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করেছিল।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক পাবলো সিমন মনে করেন, সানচেজ এই যুদ্ধবিরোধী অবস্থানকে বিশ্বজুড়ে তার নৈতিক প্রভাব বৃদ্ধির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছেন। ডোনাল্ড ট্রাম্পের মতো নেতার সামনে রুখে দাঁড়িয়ে তিনি নিজেকে আন্তর্জাতিক প্রগতিশীল আন্দোলনের একজন শীর্ষ নেতা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে চাইছেন। এর আগে ফিলিস্তিন রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি দিয়েও তিনি স্পেনের বামপন্থী ভোটারদের মন জয় করেছিলেন, যা আগামী বছরের সাধারণ নির্বাচনে তার জন্য ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে।
তবে সানচেজের এই অনড় অবস্থানের পথে প্রধান বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে দেশটির অর্থনীতি। স্পেন তার জ্বালানি চাহিদার প্রায় ৭০ শতাংশ আমদানির ওপর নির্ভরশীল এবং যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে দেশটিতে জ্বালানি তেলের দাম অন্তত ১০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। স্পেনের জিডিপির ১৩ শতাংশ আসে পর্যটন খাত থেকে, যা বর্তমান যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। ফ্লাইটের জ্বালানি খরচ বৃদ্ধি এবং পর্যটকদের মধ্যে নিরাপত্তাহীনতা দেখা দিলে সানচেজ সরকার অভ্যন্তরীণভাবে চাপের মুখে পড়তে পারে।
স্পেনের বিরোধী দলগুলো অবশ্য সানচেজের এই অবস্থানকে তার সরকারের ব্যর্থতা ঢাকার চেষ্টা হিসেবে দেখছে। পিপি এবং ভক্স-এর মতো ডানপন্থী দলগুলো শুরুতে -ইসরায়েল হামলাকে সমর্থন করলেও জনমতের চাপে পরে কিছুটা নমনীয় হয়েছে। সানচেজ পার্লামেন্টে বিরোধী দলগুলোকে সরাসরি আক্রমণ করে বলেছেন, একটি অবৈধ যুদ্ধের মুখে নীরব থাকা কোনো বিচক্ষণতা নয় বরং তা কাপুরুষতার নামান্তর। তিনি মনে করেন, আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করে চালানো এই যুদ্ধকে সমর্থন করার কোনো যৌক্তিকতা নেই।
আগামী ১৭ মে স্পেনের আন্দালুসিয়া অঞ্চলের নির্বাচন এবং পরবর্তী বছরের সাধারণ নির্বাচন সানচেজের এই পররাষ্ট্রনীতির অগ্নিপরীক্ষা হিসেবে কাজ করবে। যদি জ্বালানির দাম এবং অর্থনৈতিক মন্দা সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রাকে অতিষ্ঠ করে তোলে, তবে যুদ্ধের বিরুদ্ধে তার এই নৈতিক অবস্থান ভোটের বাক্সে কতটা ফলপ্রসূ হবে তা নিয়ে সংশয় রয়েছে। তবুও পেদ্রো সানচেজ ইতিহাসে এমন একজন নেতা হিসেবে নিজেকে প্রমাণ করতে চাইছেন, যিনি ওয়াশিংটনের অন্ধ অনুসারী না হয়ে নিজ দেশের জনগণের আবেগ এবং আন্তর্জাতিক ন্যায়বিচারের পক্ষে দাঁড়িয়েছেন।
A Publication of MUNA National Communication, Media & Cultural Department. 1033 Glenmore Ave, Brooklyn, NY 11208, United States.