03/23/2026 হরমুজ প্রণালীতে ইরানের নৌ কৌশলে বিপাকে পড়ছে আমেরিকান জেট
মুনা নিউজ ডেস্ক
২২ মার্চ ২০২৬ ২২:০৫
আমেরিকার এ-১০ অ্যাটাক জেট ও অ্যাপাচি হেলিকপ্টারগুলো হরমুজ প্রণালিতে খুব সামান্য উচ্চতায় গর্জন করে উড়ে যাচ্ছিল ইরানি স্পিডবোটগুলোকে শিকার করতে। ইরানি এই স্পিডবোটগুলো বেশ দ্রুতগামী।
ইরানের দ্রুতগামী আক্রমণকারী এসব বোট এবং উপকূল ও বিভিন্ন দ্বীপে থাকা মিসাইল ঘাঁটিগুলো ধ্বংস করার লক্ষ্যে নেমেছে এসব ফাইটার ও হেলিকপ্টার। তাদের মূল লক্ষ্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই নৌপথটি পুনরায় উন্মুক্ত করা এবং বৈশ্বিক জ্বালানি সংকটের অবসান ঘটানো।
তবে সংকীর্ণ এই প্রণালিতে নৌ চলাচলের জন্য প্রধান হুমকি এসব বোট বা মিসাইল নয়, এমন কিছু যা আমেরিকান জেটগুলো দেখতে পায় না ও সহজে লক্ষ্যবস্তু বানাতে পারে না। আর এক হুমকি হলো—পারস্য উপসাগরের অগভীর ও ঘোলা জলে চলাচলের জন্য বিশেষভাবে নকশা করা ইরানের একটি ছোট ‘মিজেট’ (ক্ষুদ্রাকৃতির) সাবমেরিন বহর।
ইরানের কাছে প্রায় ১০টি গাদির-ক্লাস মিজেট সাবমেরিন রয়েছে, যেগুলোর ওজন ১২০ টন এবং দৈর্ঘ্য ২৯ মিটার—অর্থাৎ সাধারণ অ্যাটাক সাবমেরিনের তুলনায় এগুলোর আকার প্রায় দশ ভাগের এক ভাগ।
আমেরিকার ওহাইও-ক্লাস পারমাণবিক সাবমেরিনের তুলনায় (ওজন ১৮ হাজার ৭৫০ টন এবং দৈর্ঘ্য ১৭০ মিটার) এগুলোর আকার অত্যন্ত ছোট। ইরানি মিজেটগুলো মাত্র ৩০ মিটার গভীরতার অগভীর জলেও শনাক্তকরণ এড়িয়ে চলতে সক্ষম, যা এই প্রণালির গুরুত্বপূর্ণ শিপিং চ্যানেলগুলোর গড় গভীরতা।
প্রণালির পরিবেশ—অগভীর জল এবং সেই সঙ্গে জাহাজ চলাচল ও ড্রিলিং অপারেশনের বিকট শব্দ—আমেরিকার জন্য এই মিনি-সাবমেরিনগুলোকে খুঁজে বের করা এবং ধ্বংস করা কঠিন করে তুলবে।
গাদির-ক্লাস সাবমেরিনগুলো পাশ দিয়ে যাওয়া ট্যাংকার লক্ষ্য করে ‘হুত’ টর্পেডো ছুড়তে সক্ষম। ইরানি সূত্রের দাবি অনুযায়ী, সুপারক্যাভিটেটিং প্রযুক্তির কারণে এটি পানির নিচে ঘণ্টায় ২২০ মাইল বেগে চলতে পারে, যা পানির ঘর্ষণ ও বাধা কমিয়ে দেয়।
বিশ্লেষকেরা বলেছেন, রাতের বেলায় একটি মাত্র গাদির-ক্লাস সাবমেরিন শনাক্ত না হয়েই শিপিং চ্যানেলগুলোতে কয়েক ডজন মাইন পেতে রাখতে পারে। ইরান চার দশক ধরে পারস্য উপসাগরের সুনির্দিষ্ট পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করেছে এবং তাদের সাবমেরিন চালকদের একচেটিয়াভাবে এই জলসীমাতেই প্রশিক্ষণ দিয়েছে।
ইরান সরকার প্রণালির ভৌগোলিক অবস্থান এবং বিশেষভাবে তৈরি এই মিনি-সাবমেরিনগুলোকে ব্যবহার করে বিশ্ব অর্থনীতিকে জিম্মি করছে এবং বৈশ্বিক নৌ যোগাযোগকে নিজেদের কবজায় রাখার চেষ্টা অভিযোগ রয়েছে।
ইরানের অস্ত্রাগারে গাদির-ক্লাস সাবমেরিনই একমাত্র সরঞ্জাম নয়। ইরানি ই-গাভাসি এবং আল-সাবেহাত হলো ‘সুইমার ডেলিভারি ভেহিকল’, যার মাধ্যমে কমব্যাট পাইলটরা অগভীর উপকূলীয় এলাকায় বিশেষ অভিযান এবং গোপনে মাইন স্থাপনের কাজ করতে পারে। এগুলোতে ওয়ারহেড বসিয়ে ‘সুইসাইড ভেসেল’ বা আত্মঘাতী জাহাজ হিসেবেও ব্যবহার করা যেতে পারে।
ফাতেহ-ক্লাস সাবমেরিনগুলো আকারে কিছুটা বড়, ওজন প্রায় ৬০০ টন। এতে উন্নত সেন্সর ও টর্পেডো রয়েছে এবং এটি উপকূলের কাছাকাছি থেকে গভীর পানিতেও কাজ করতে সক্ষম। পুরোনো মডেলগুলোর মধ্যে রয়েছে নাহাং মিজেট সাবমেরিন এবং তিনটি কিলো-ক্লাস ডিজেল-ইলেকট্রিক সাবমেরিন, যা ইরান ১৯৯০-এর দশকে রাশিয়ার কাছ থেকে কিনেছিল। তারেঘ, ইউনেস এবং নূহ নামের এই কিলো সাবমেরিনগুলো আকারে বড়, তবে পারস্য উপসাগরের উত্তরের অগভীর অংশে এগুলো কার্যকরভাবে কাজ করতে হিমশিম খায়।
বেসাত-ক্লাস হলো ইরানের নতুন আধা-ভারী সাবমেরিন ডিজাইন, যদিও এর উৎপাদন সংক্রান্ত তথ্য সীমিত। সব ধরনের সাবমেরিনই টর্পেডো এবং নৌ-মাইন বহন করতে পারে। ইরানের প্রাথমিক লক্ষ্য আমেরিকান যুদ্ধজাহাজ ডুবিয়ে দেওয়া নয়, বরং গোপনে মাইন পেতে শিপিং চ্যানেলগুলো বন্ধ করে দেওয়া, যা পরিষ্কার করতে কয়েক সপ্তাহ সময় লেগে যাবে।
ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) নৌবাহিনী শত শত দ্রুতগামী আক্রমণকারী জাহাজ পরিচালনা করে, যা সংকীর্ণ জলসীমায় ‘ঝাঁক বেঁধে আক্রমণের’ (swarm tactics) জন্য তৈরি। জুলফিকার-ক্লাস বোটগুলোতে আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা রয়েছে এবং এগুলো ইরানের সবচেয়ে সক্ষম দ্রুতগামী আক্রমণকারী জাহাজ।
তবে এই বহরের বেশির ভাগই হলো ছোট সশস্ত্র স্পিডবোট, যা পারস্য উপসাগর বরাবর ইরানের দীর্ঘ উপকূলরেখার ছোট ছোট বন্দর এবং খাঁড়ি থেকে কাজ করতে পারে। ‘বাভার ২’ হলো একটি সংকর পদ্ধতি—এটি একটি ‘উড়ন্ত নৌকা’, যা গতি বাড়াতে এবং রাডার ফাঁকি দিতে পানির উপরিভাগের ঠিক উপর দিয়ে উড়তে পারে।
ইরান সাম্প্রতিক বছরগুলোতে রিমোট-কন্ট্রোলড কামিকাজে বোটও প্রদর্শন করেছে। এগুলো বিস্ফোরক ভর্তি চালকবিহীন জাহাজ, যা উপকূলীয় এলাকায় আগে থেকেই মোতায়েন রাখা যায় এবং প্রয়োজন অনুযায়ী সক্রিয় করা যায়।
আমেরিকান বিমান হামলায় আইআরজিসির কিছু নৌ ঘাঁটি ধ্বংস হয়েছে, কিন্তু এই বোটগুলোর জন্য খুব সামান্য লঞ্চিং পয়েন্ট প্রয়োজন এবং এগুলো সাধারণ বেসামরিক বন্দরেও লুকিয়ে রাখা যায়, ফলে এগুলো সম্পূর্ণ ধ্বংস করা প্রায় অসম্ভব। ইরানের ট্রাক-মাউন্টেড বা ভ্রাম্যমাণ জাহাজ-বিধ্বংসী মিসাইলগুলো স্পিডবোটের চেয়েও বড় দীর্ঘমেয়াদি হুমকি, কারণ আকাশ থেকে এগুলোকে সহজে লক্ষ্যবস্তু বানানো যায় না।
কাউসার ক্রুজ মিসাইলের পাল্লা ১২ থেকে ১৫ মাইল এবং নাসর-১ এর পাল্লা ২২ মাইল পর্যন্ত। উভয়ই উপকূলীয় জলসীমার জাহাজগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করে। তেহরানের অস্ত্রাগারে কাদির এবং গাদির জাহাজ-বিধ্বংসী ক্রুজ মিসাইলও রয়েছে যেগুলোর পাল্লা ১৮৬ মাইল পর্যন্ত। এ ছাড়া চীনা সি–৮০২ এর ওপর ভিত্তি করে তৈরি নূর ক্রুজ মিসাইলের পাল্লা ১০৬ মাইল পর্যন্ত।
এগুলোর সব কটিই প্রণালি ছাড়িয়ে ওমান উপসাগরের গভীরে থাকা জাহাজগুলোতে আঘাত হানতে সক্ষম। আবু মাহদি ক্রুজ মিসাইলের পাল্লা ৬২১ মাইল বলে জানা গেছে, যা ইরানি ভূখণ্ড থেকে অনেক দূরে থাকা জাহাজের জন্যও হুমকি হতে পারে।
ইরান পারস্য উপসাগর (খালিজ-এ ফারস) এবং হরমুজ-২ নামের জাহাজ-বিধ্বংসী ব্যালিস্টিক মিসাইলও তৈরি করেছে। ১৮৬ মাইল পাল্লার এই মিসাইলগুলো স্যাটেলাইট গাইডের মাধ্যমে চলন্ত জাহাজে আঘাত হানার জন্য ডিজাইন করা হয়েছে। এই অস্ত্রগুলো ট্রাকে বহনযোগ্য, পাহাড়ের সুড়ঙ্গে লুকানো এবং সুরক্ষিত বাংকারে রাখা হয় এবং এগুলো প্রতিনিয়ত স্থানান্তর করা হয়।
ইরানের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের সম্প্রতি প্রকাশিত ফুটেজ অনুযায়ী, তারা সাবমেরিন থেকে শাহেদ কামিকাজে ড্রোন উৎক্ষেপণের সক্ষমতাও দেখিয়েছে। যেখানে একটি চালকবিহীন সাবমেরিন থেকে ‘হাদিদ-১১০’ জেট-চালিত ড্রোন ছুড়তে দেখা যায়।
সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, সাবমেরিনের সবচেয়ে বিপজ্জনক ক্ষমতা টর্পেডো নয়, বরং মাইন।
ইরানের কাছে কয়েক দশক ধরে জমানো নৌ-মাইনের বিশাল মজুত রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে কন্টাক্ট মাইন (যা স্পর্শ করলে বিস্ফোরিত হয়), ম্যাগনেটিক মাইন (যা জাহাজের চৌম্বকীয় সংকেত শনাক্ত করে), অ্যাকোস্টিক মাইন (যা ইঞ্জিনের শব্দে সক্রিয় হয়) এবং প্রেশার মাইন (যা জাহাজ যাওয়ার সময় পানির চাপের পরিবর্তন অনুভব করতে পারে)।
আরও উন্নত সংস্করণগুলো বিভিন্ন ধরনের জাহাজের মধ্যে পার্থক্য করতে পারে। কিছু মাইন এমনভাবে প্রোগ্রাম করা থাকে যে সেগুলো ছোট মাইনসুইপার জাহাজকে ছেড়ে দিলেও বড় বাণিজ্যিক তেল ট্যাংকার শনাক্ত করলেই বিস্ফোরিত হবে।
A Publication of MUNA National Communication, Media & Cultural Department. 1033 Glenmore Ave, Brooklyn, NY 11208, United States.