03/18/2026 তেহরানের পারমাণবিক প্রস্তাবে এড়ানো যুদ্ধের ঝুঁকি যেত: ব্রিটিশ নিরাপত্তা উপদেষ্টা
মুনা নিউজ ডেস্ক
১৮ মার্চ ২০২৬ ১৬:০৬
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে চূড়ান্ত আলোচনায় অংশ নিয়েছিলেন যুক্তরাজ্যের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা জনাথন পাওয়েল। ব্রিটিশ এই কর্মকর্তার মতে, তেহরান তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে যে প্রস্তাব দিয়েছিল, তাতে একটি চুক্তিতে পৌঁছানো সম্ভব ছিল। এর মাধ্যমে যুদ্ধের ঝুঁকিও এড়ানো যেত।
জেনেভায় গত ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে অনুষ্ঠিত আলোচনায় অগ্রগতি হয়েছিল বলে মনে করেন পাওয়েল। সংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাতে জানা গেছে, ইরানের পক্ষ থেকে যেসব প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল, তাকে ‘বিস্ময়কর’ বলে অভিহিত করেছেন তিনি।
ওই প্রস্তাব অনুযায়ী, ভবিষ্যতে ইরানের একটি বেসামরিক পারমাণবিক কর্মসূচিতে অংশ নেওয়ার সুযোগ পেত যুক্তরাষ্ট্র।
আলোচনা শেষ হওয়ার দুই দিন পর এবং ভিয়েনায় কারিগরি পর্যায়ের পরবর্তী আলোচনার তারিখ নির্ধারিত হওয়ার পরপরই ইরানে এই হামলা চালায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল।
আলোচনায় পাওয়েলের উপস্থিতি এবং এর অগ্রগতি সম্পর্কে তাঁর গভীর জানাশোনা ছিল—এমন তিনটি ভিন্ন সূত্র এ তথ্য নিশ্চিত করেছে ।
সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র জানায়, জেনেভার কোলনিতে ওমানের রাষ্ট্রদূতের বাসভবনে উপদেষ্টা হিসেবে উপস্থিত ছিলেন পাওয়েল। আলোচনায় যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধি হিসেবে ডোনাল্ড ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনার এবং ট্রাম্পের বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফের অভিজ্ঞতা নিয়ে যে ব্যাপক উদ্বেগ ছিল, পাওয়েলের উপস্থিতি মূলত সেটিই ফুটিয়ে তোলে।
জেনেভা আলোচনায় কারিগরি সহায়তার জন্য আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার (আইএইএ) মহাপরিচালক রাফায়েল গ্রসিকে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন কুশনার ও উইটকফ। যদিও কুশনার পরে দাবি করেন, এই আলোচনার গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো নিয়ে তাঁর ও উইটকফের ‘বেশ গভীর জানাশোনা’ রয়েছে।
পরমাণু–বিশেষজ্ঞরা পরে বলেন, ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে উইটকফের দেওয়া বক্তব্যগুলোয় অসংখ্য মৌলিক ভুল ছিল।
মধ্যস্থতাকারী হিসেবে পাওয়েলের দীর্ঘ অভিজ্ঞতা রয়েছে। একটি সূত্রের দাবি, আলোচনার সময় যুক্তরাজ্যের মন্ত্রিপরিষদ কার্যালয়ের একজন বিশেষজ্ঞকেও সঙ্গে নিয়েছিলেন তিনি। একজন পশ্চিমা কূটনীতিক বলেন, ‘জনাথন মনে করেছিলেন একটি চুক্তিতে পৌঁছানো সম্ভব। তবে ইরান তখনো পুরোপুরি প্রস্তুত ছিল না, বিশেষ করে তাদের পারমাণবিক কেন্দ্রগুলোয় জাতিসংঘের পরিদর্শনের বিষয়ে।’
জেনেভা আলোচনা সম্পর্কে অংশগ্রহণকারীদের কাছ থেকে তথ্য পেয়েছেন—এমন সাবেক এক কর্মকর্তা জানান, উইটকফ ও কুশনার তাঁদের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের কোনো কারিগরি দল (টেকনিক্যাল টিম) আনেননি। তাঁরা গ্রসিকেই তাঁদের কারিগরি বিশেষজ্ঞ হিসেবে ব্যবহার করেছিলেন, যদিও এটি তাঁর কাজ নয়। তাই জনাথন পাওয়েল তাঁর নিজস্ব বিশেষজ্ঞ দল সঙ্গে নিয়েছিলেন।
সাবেক ওই কর্মকর্তা আরও যোগ করেন, ইরানিদের পক্ষ থেকে আসা প্রস্তাবগুলো দেখে ব্রিটিশ প্রতিনিধিদল রীতিমতো বিস্মিত হয়েছিল।
ওই কর্মকর্তা আরও বলেন, এটি কোনো পূর্ণাঙ্গ চুক্তি ছিল না, তবে অগ্রগতি হয়েছিল এবং এটিই যে ইরানিদের শেষ প্রস্তাব ছিল, তা-ও নয়। যুক্তরাজ্যের প্রতিনিধিদল আশা করেছিল, জেনেভায় হওয়া অগ্রগতির ভিত্তিতে আলোচনার পরবর্তী ধাপ এগিয়ে যাবে।
পরবর্তী ধাপের সেই আলোচনা ২ মার্চ ভিয়েনায় অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা ছিল, কিন্তু তা আর হয়নি। কারণ, এর দুই দিন আগেই ইরানে সর্বাত্মক আগ্রাসন শুরু করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল।
জেনেভায় সেই আলোচনা এবং চলতি মাসের শুরুর দিকে ওই শহরেই অনুষ্ঠিত পূর্ববর্তী বৈঠকগুলোয় পাওয়েলের উপস্থিতি যুক্তরাজ্যের অবস্থান স্পষ্ট করতে সাহায্য করে। মূলত এ কারণেই ইরানে যুক্তরাষ্ট্রের চালানো হামলায় সমর্থন দিতে অনীহা জানিয়েছিল যুক্তরাজ্য সরকার। আর এই অনীহার ফলে যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার সম্পর্ক নজিরবিহীন টানাপোড়েনের মুখে পড়েছে।
ইউরোপে ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র হামলার আসন্ন কোনো হুমকি কিংবা ইরানের পারমাণবিক অস্ত্র অর্জনের কোনো অকাট্য প্রমাণ পায়নি যুক্তরাজ্য। এই প্রথম এটি স্পষ্ট হলো, ওই আলোচনায় যুক্তরাজ্য অত্যন্ত নিবিড়ভাবে জড়িত ছিল। ফলে কূটনৈতিক পথ সত্যিই রুদ্ধ হয়ে গিয়েছিল কি না এবং যুক্তরাষ্ট্রের এ হামলা প্রয়োজনীয় ছিল কি না, তা যাচাই করার মতো যথেষ্ট যৌক্তিক কারণ যুক্তরাজ্যের কাছে ছিল।
যুক্তরাজ্য এই হামলাকে বেআইনি ও অকালপক্ব হিসেবে গণ্য করেছে। কারণ, পাওয়েল বিশ্বাস করতেন, ইরান কীভাবে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি না করার বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রকে আশ্বস্ত করতে পারে—সেই দীর্ঘস্থায়ী সমস্যার একটি সমঝোতামূলক সমাধানের পথ তখনো খোলা ছিল।
জেনেভা আলোচনায় পাওয়েলের উপস্থিতি বা এ নিয়ে তাঁর মতামতের বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে ডাউনিং স্ট্রিট।
যুক্তরাষ্ট্রের হামলায় পর্যাপ্ত সমর্থন না দেওয়ায় কিয়ার স্টারমার বারবার ট্রাম্পের কঠোর সমালোচনার শিকার হয়েছেন। এই সমালোচনার অন্যতম কারণ ছিল শুরুতে যুক্তরাষ্ট্রকে যুক্তরাজ্যের সামরিক ঘাঁটিগুলো ব্যবহারের অনুমতি দিতে স্টারমারের অস্বীকৃতি। পরবর্তী সময়ে ইরান যখন পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে যুক্তরাজ্যের মিত্রদের ওপর পাল্টা হামলা শুরু করে, তখন কেবল আত্মরক্ষামূলক কাজে ওই ঘাঁটিগুলো ব্যবহারের অনুমতি দেন তিনি।
হরমুজ প্রণালি উন্মুক্ত করতে সাহায্য করার জন্য ট্রাম্পের আহ্বানে ইউরোপীয় সদস্য দেশগুলো সাড়া না দেওয়ায় সর্বশেষ তিনি হুঁশিয়ারি দেন, এটি ন্যাটোর জন্য খারাপ হতে পারে। তাঁর এই দাবি ইতিমধ্যে প্রত্যাখ্যাত হয়েছে।
জেনেভায় ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে এই পরোক্ষ আলোচনায় মধ্যস্থতা করছিলেন ওমানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বদর বিন হামাদ আল বুসাইদি। উপসাগরীয় অঞ্চলের কূটনীতিকেরা নির্দিষ্ট করে জানাননি, ঠিক কোন ভিত্তিতে পাওয়েলকে এই আলোচনায় অংশগ্রহণের সুযোগ দেওয়া হয়েছিল। তবে ধারণা করা হচ্ছে, বছরের পর বছর ধরে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে তাঁর গড়ে ওঠা সুসম্পর্কের কারণেই এটি সম্ভব হয়েছে। বিশেষত এর আগে টনি ব্লেয়ারের চিফ অব স্টাফ হিসেবে তাঁর কাজের অভিজ্ঞতার বিষয়টি এখানে প্রভাব ফেলে থাকতে পারে।
পরে যুক্তরাজ্যের কর্মকর্তারা ব্যাখ্যা করেছেন, তাঁরা একটি বিষয়ে বেশ প্রভাবিত হয়েছিলেন। আর তা হলো, ইরান এই চুক্তিটি স্থায়ী করতে প্রস্তুত ছিল। ২০১৫ সালের পারমাণবিক চুক্তির মতো এতে কোনো নির্দিষ্ট সময়সীমা ছিল না, যা একটি নির্দিষ্ট সময় পর ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির ওপর থেকে বিধিনিষেধ তুলে নেবে।
তারপরও ইরান তাদের কাছে থাকা ৪৪০ কেজি উচ্চমাত্রার সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুত আইএইএর তত্ত্বাবধানে ইরানের ভেতরেই কমিয়ে ফেলতে সম্মত হয়েছিল। এ ছাড়া ভবিষ্যতে উচ্চমাত্রার সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের আর কোনো মজুত গড়ে তোলা হবে না বলেও তারা রাজি হয়েছিল।
আলোচনার শেষ অধিবেশনে ইরান অভ্যন্তরীণ ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কর্মসূচি ৩ থেকে ৫ বছরের জন্য স্থগিত রাখতে সম্মত হয়েছিল। কিন্তু বিকেলের অধিবেশনে ট্রাম্পের সঙ্গে পরামর্শ করার পর যুক্তরাষ্ট্র এই স্থগিতাদেশের মেয়াদ ১০ বছর করার দাবি জানায়।
বাস্তবে ২০২৫ সালে ইরানের সমৃদ্ধকরণ কেন্দ্রগুলোয় বোমাবর্ষণের কারণে দেশটির অভ্যন্তরীণভাবে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করার মতো আর কোনো সক্ষমতা বা উপায় অবশিষ্ট ছিল না।
ইরান বিশাল এক অর্থনৈতিক সুবিধারও প্রস্তাব দিয়েছিল, যাকে মধ্যস্থতাকারীরা অত্যন্ত আকর্ষণীয় বলে বর্ণনা করেছেন। এ প্রস্তাব অনুযায়ী, ভবিষ্যতে ইরানের একটি বেসামরিক পারমাণবিক কর্মসূচিতে অংশ নেওয়ার সুযোগ পেত যুক্তরাষ্ট্র।
বিনিময়ে ইরানের ওপর আরোপিত প্রায় ৮০ শতাংশ অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করে নেওয়া হতো। এর মধ্যে কাতারে আটকে থাকা সম্পদগুলোও অন্তর্ভুক্ত ছিল—যে দাবিটি ইরান ২০২৫ সালের আলোচনায় উত্থাপন করেছিল।
ওমানের মধ্যস্থতাকারীর মতে, উচ্চমাত্রার সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুত শূন্যে নামিয়ে আনার এই প্রস্তাব ছিল বড় ধরনের এক অগ্রগতি, যার অর্থ দাঁড়ায় একটি চূড়ান্ত চুক্তি প্রায় হাতের নাগালেই ছিল।
ট্রাম্পের জামাতা কুশনার যখন আলোচনা ছেড়ে যান, তখন তাঁর মনোভাব নিয়ে পরস্পরবিরোধী বিবরণ পাওয়া গেছে। কারও মতে, তিনি এমন একটি ধারণা দিয়েছিলেন, ট্রাম্প এই সমঝোতাকে স্বাগত জানাবেন। আবার অন্যদের মতে, মার্কিন আলোচনাকারীরা জানতেন যে যুদ্ধই যে সেরা বিকল্প নয়—তা ট্রাম্পকে বোঝাতে হলে অনেক বড় বা অভাবনীয় কিছুর প্রয়োজন হবে।
আলোচনার বিষয়ে অবগত উপসাগরীয় অঞ্চলের একজন কূটনীতিক বলেছেন, ‘আমরা উইটকফ ও কুশনারকে ইসরায়েলের লোক হিসেবে গণ্য করেছিলাম, যাঁরা একজন প্রেসিডেন্টকে এমন এক যুদ্ধের দিকে টেনে নিয়ে গেছে, যা থেকে তিনি আসলে বেরিয়ে আসতে চেয়েছিলেন।’
ওয়েলশ জাতীয়তাবাদী দল প্লাইড কামরির এমপি লিজ সেভিল রবার্টস গতকাল মঙ্গলবার পার্লামেন্টে পাওয়েলের উপস্থিতির বিষয়ে দ্য গার্ডিয়ানের প্রতিবেদনটি উল্লেখ করেছেন। যুক্তরাজ্যের পররাষ্ট্রসচিব ইভেট কুপারের দেওয়া একটি হালনাগাদ তথ্যের সময় তিনি এ প্রসঙ্গ উত্থাপন করেন।
কুপারকে সেভিল বলেন, ‘এটি স্পষ্ট যে কূটনৈতিক বিকল্পগুলো তখনো কার্যকর ছিল এবং ইউরোপের ওপর কোনো আসন্ন ক্ষেপণাস্ত্র হামলার হুমকি কিংবা ইরানের পারমাণবিক অস্ত্র শিগগিরই তৈরির কোনো প্রমাণও ছিল না।’
সেভিল আরও বলেন, ‘তিনি (কুপার) কি তাহলে বিশ্বাস করেন, সেই সময়ে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে আলোচনার মাধ্যমে সমঝোতার পথ তখনো সম্ভব ছিল? আর যদি তা-ই হয়, তবে কি এর অর্থ এই দাঁড়ায় না যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের প্রাথমিক হামলাগুলো ছিল অপরিণত এবং অবৈধ?’
জবাবে ইভেট কুপার বলেন, ‘যুক্তরাজ্য পারমাণবিক আলোচনাকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন আলোচনা ও কূটনৈতিক প্রক্রিয়ায় সব সময়ই সমর্থন দিয়ে এসেছিল।’
কুপার আরও যোগ করেন, ‘আমরা মনে করি, সেটি (কূটনৈতিক পথ) একটি গুরুত্বপূর্ণ পথ ছিল এবং আমরা চেয়েছিলাম এটি অব্যাহত থাকুক। যুক্তরাষ্ট্র প্রাথমিকভাবে যেসব হামলা চালিয়েছিল, সে বিষয়ে আমরা যে অবস্থান নিয়েছিলাম—এটি ছিল তার অন্যতম প্রধান কারণ।’
A Publication of MUNA National Communication, Media & Cultural Department. 1033 Glenmore Ave, Brooklyn, NY 11208, United States.