02/12/2026 ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন এবং গণভোটের জন্য প্রস্তুত বাংলাদেশ
মুনা নিউজ ডেস্ক
১১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ২১:২১
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটের সকল প্রস্তুতি সম্পন্ন। ভোটের অপেক্ষায় সারা বাংলাদেশ। ১২ ফেব্রুয়ারি ভোটের পরিবেশ কেমন থাকবে সেদিকেই এখন সবার দৃষ্টি। ভোটের জোয়ার কোনদিকে ধাবিত হচ্ছে এ নিয়ে চারদিকে টানটান উত্তেজনা। পাড়া-মহল্লা, হাট-বাজার, অফিস, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, যানবাহন স্টেশন, রেস্টুরেন্ট থেকে শুরু করে সর্বত্র এখন একই আলাপ অবাধ-সুষ্ঠু নির্বাচন হবে তো। সর্বস্তরের মানুষের মধ্যে এটি এখন এটি ‘টক অব দ্য কান্ট্রি।’
সারাদেশে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের জমজমাট নির্বাচনী প্রচার শেষ হয়েছে মঙ্গলবার। রাত পোহালেই বৃহসস্পতিবার বহুল কাক্সিক্ষত সেই জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট। এবারই প্রথম সংসদ নির্বাচনের সঙ্গে হচ্ছে গণভোট। জুলাই সনদ বাস্তবায়নের জন্যই এ গণভোট হচ্ছে। ভিন্ন এক পরিবেশে নির্বাচন হওয়ায় এবারের নির্বাচন নিয়ে দেশের মানুষের পাশাপাশি বিদেশের বিভিন্ন মহলও প্রবল আগ্রহ নিয়ে অপেক্ষা করছে। বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী ও এনসিপিসহ ৫১টি রাজনৈতিক দল অংশ নিচ্ছেছ এ নির্বাচনে। ২ হাজার ৪ জন প্রার্থীর মধ্যে রয়েছে পৌনে ৩শ’ স্বতন্ত্র প্রার্থী।
প্রার্থীরা দিনরাত কঠোর পরিশ্রম করে নিজ নিজ নির্বাচনী এলাকা চষে বেড়িয়েছেন। পাড়া-মহল্লা বাড়ি বাড়ি গিয়ে হাসিমুখে ভোট প্রার্থনা করছেন। মা-বোনসহ মুরব্বিদের দোয়া নিয়েছেন। ২২ জানুয়ারি শুরু হয় নির্বাচনী প্রচার যা শেষ হয় মঙ্গলবার।
বড় রাজনৈতিক দলগুলো দলের সর্বস্তরের নেতাকর্মীদের সঙ্গে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রেখে ভোটের প্রস্তুতি জোরদার করছে। সেই সঙ্গে দলের বাইরের যারা ভোটে প্রভাব বিস্তার করতে পারে তাদের সঙ্গেও যোগাযোগ করছে। বিশেষ করে যারা পোলিং এজেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন তাদের ভোটের দিন সার্বক্ষণিক সক্রিয় থাকার নির্দেশ দেওয়া হচ্ছে। এ ছাড়া প্রতিটি কেন্দ্রের বাইরে যারা দলের হয়ে স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে দায়িত্ব পালন করবে তাদেরও সার্বিক নির্দেশনা দেওয়া হচ্ছে। স্বতন্ত্র প্রর্থীরাও নিজেদের মতো করে শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতি চালিয়ে যাচ্ছেন।
১১ ডিসেম্বর তফসিল ঘোষণার পর থেকেই জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে তৎপর হয় বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও প্রার্থীরা। ২১ জানুয়ারি প্রতীক পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সরাসরি ভোটের মাঠে সরব হয়ে পড়েন প্রার্থীরা। সেই সঙ্গে তাদের দলের নেতাকর্মী, সমর্থক ও স্বজনসহ সংশ্লিষ্ট সবাই প্রকাশ্যে মাঠে সক্রিয় হন। অনেক প্রার্থী দিনরাত বিরামহীন বিপুলসংখ্যক নেতাকর্মী ও সমর্থক সঙ্গে নিয়ে শোডাউন করে পাড়া-মহল্লায় প্রতিদিন গণসংযোগ করেন। প্রার্থীদের ছবি ও প্রতীক সংবলিত ব্যানার, প্ল্যাকার্ড ও বিলবোর্ডে ছেয়ে যায় অলি, গলি ও রাজপথ। তবে এবারই প্রথম প্রার্থীদের পোস্টার ব্যবহার করতে দেওয়া হয়নি।
বড় বড় রাজনৈতিক দলের শীর্ষ নেতারা সারাদেশের জেলায় জেলায় গিয়ে দলের পক্ষে ভোট প্রার্থনা করেন। বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান রাজধানীতে ১৬টিসহ সারাদেশে ৪৪টি জনসভা করে দলের জন্য ভোট চান। জামায়াতের আমির ডা. শফিকুর রহমানও ৪৮টি জেলায় জনসভা করে দলের জন্য ভোট চান। এভাবে অন্যান্য দলের শীর্ষ নেতা সারাদেশে জনসভা করে ভোট প্রার্থনা করেছেন। আর প্রার্থীরা নিজের অনুসারী ও স্বজনদের নিয়ে বাড়ি-বাড়ি ও ঘরে ঘরে গিয়ে ভোটারদের সঙ্গে কুশল বিনিময়, সভা-সমাবেশ ও মিছিলের পাশাপাশি মাইকিং করে বিরামহীন ভোট প্রার্থনা করেন মঙ্গলবার সকাল সাড়ে ৭টা পর্যন্ত। ভোটের সার্বিক পরিবেশ অনুকূলে থাকায় সারাদেশে উৎসবমুখর পরিবেশ বিরাজ করে। নিজ নিজ এলাকায় ভোট দিতে রাজধানীসহ সারাদেশের শহরগুলো থেকে বিপুলসংখ্যক মানুষ ছুটে যাচ্ছে গ্রামে। এর আগের ৩টি জাতীয় নির্বাচনে এমনটি লক্ষ্য করা যায়নি।
এদিকে নির্বাচন কমিশন এবার ভোটের পরিবেশ সুষ্ঠু রাখতে কঠোর মনিটরিং ব্যবস্থা নিশ্চিত করেছে। এর ফলে প্রার্থীরা নির্বাচনের আচরণবিধি ভঙ্গ করে কি না সেদিকে কঠোর দৃষ্টি রাখে নির্বাচন কশিমন। প্রতিটি এলাকায় দায়িত্বরত ইসি কর্মকর্তা, প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এ বিষয়ে অধিকতর তৎপর থাকায় আচরণবিধি ভঙ্গের বিষয়টি এবার কোনো প্রার্থী এড়িয়ে যেতে পারেনি। অনেক প্রার্থীকে শোকজ নোটিস করে সংশোধনের সুযোগ দেয় নির্বাচন কমিশন।
এবার জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নিতে রেকর্ড সংখ্যক অর্থাৎ ৩ হাজারেরও বেশি প্রার্থী মনোনয়নপত্র দাখিল করলেও প্রাথমিক বাছাইয়ে বাদ পড়েছিলেন অনেকেই। এর মধ্যে আবার আপিলে প্রার্থিতা ফিরে পান বেশ ক’জন। ইসির আপিলে ব্যর্থ হয়ে উচ্চ আদালতেও আপিল করেন বেশ ক’জন। তাদের মধ্যে কেউ কেউ প্রার্থিতা ফিরে পান।
শেষ পর্যন্ত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের চূড়ান্ত লড়াইয়ে ৩০০ আসনের মধ্যে (শেরপুর-৩ ছাড়া) ২৯৯ আসনে ভোটের প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন ২ হাজার ৪ জন প্রার্থী। এর মধ্যে স্বতন্ত্র হিসেবে লড়ছেন ২৭৫ জন। ৫১টি রাজনৈতিক দলের মধ্যে উল্লেখযোগ্য বিএনপির ২৯১ জন (ধানের শীষ), জামায়াতে ইসলামীর ২২৯ জন (দাঁড়িপাল্লা), ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের ২৫৮ জন (হাতপাখা), ১৯৮ জন জাতীয় পার্টির (লাঙল) ও ৩২ জন এনসিপির (শাপলা কলি) প্রার্থী রয়েছে।
ভোটের সুষ্ঠু পরিবেশ নিশ্চিত করতে প্রধান নির্বাচন কমিশনার এএমএম নাসির উদ্দিন এবং অন্য কমিশনাররাও একেকদিন একেক জেলায় গিয়ে প্রার্থী, রাজনৈতিক দলের নেতা, প্রশাসন, নির্বাচন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও স্থানীয় জনসাধারণের সঙ্গে মতবিনিময় করেছেন। এ সময় তারা সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য সকলের সহযোগিতা কামনা করছেন। আর প্রার্থীসহ অন্যান্যরাও সুষ্ঠু নির্বাচনের পরিবেশ বজায় রাখতে সহযোগিতার আশ্বাস দিচ্ছেন। সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য নির্বাচন কমিশন সবচেয়ে বেশি সহযোগিতা চেয়েছে রাজনৈতিক দলগুলোর। নির্বাচনে অংশ নেওয়া রাজনৈতিক দলগুলোও এ বিষয়ে ইসিকে আশ্বস্ত করেছে। এ ছাড়া নির্বাচনের পরিবেশ ভালো রাখতে দেশের রাজনৈতিক দলগুলোসহ দেশি-বিদেশি বিভিন্ন সংস্থা নির্বাচন কমিশনকে সহযোগিতা দিচ্ছে।
সূত্র মতে, সুষ্ঠু নির্বাচনের স্বার্থে ভোটাররা যাতে নির্বিঘ্নে কেন্দ্রে গিয়ে ভোট দিতে পারেন সে জন্য বাস্তবমুখী বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করে নির্বাচন কমিশন। আচরণবিধিরও যথাযথ প্রয়োগ করা হচ্ছে। ইতোমধ্যেই বেশ ক’জন প্রভাবশালী প্রার্থীসহ শতাধিক প্রার্থীকে আচরণ বিধি ভঙ্গের দায়ে কারণ দর্শাও নোটিস দিয়ে তা প্রমাণ করেছে ইসি। যার বিরুদ্ধেই অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে সঙ্গে সঙ্গে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। নির্বাচনী আচরণবিধি লঙ্ঘনের দায়ে সারাদেশের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটরা ৪৬১টি ঘটনায় ২৫৯টি মামলা করেছে এবং ৩ কোটি ২১ লাখ ৫৯ হাজার ৯৫০ টাকা জরিমানা করেছে।
অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় পুলিশ, বিজিবি ও আনসার মাঠে রাখা হয়েছে। তারা সবাই ভোটের পরও ৩ দিন মাঠে থাকবে। এ ছাড়া ভোটের পরিবেশ রক্ষায় সেনাবাহিনী নিয়োজিত রয়েছে। উপকূলীয় উপজেলাগুলোতে কোস্ট গার্ডের সঙ্গে সমন্বয়ের মাধ্যমে সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী ও বিজিবি যৌথভাবে দায়িত্ব পালন করবে। বাংলাদেশ বিমানবাহিনী হেলিকপ্টারে করে দুর্গম পার্বত্য অঞ্চলের ভোটকেন্দ্রগুলোয় প্রয়োজনীয় সহায়তা দেবে। এ ছাড়া জরুরি প্রয়োজনে নির্বাচনের কাজে সহায়তার লক্ষ্যে বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর প্রয়োজনীয় সংখ্যক হেলিকপ্টার প্রস্তুত রাখা হয়েছে।
নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে এবার ভোট কেন্দ্রে সকল প্রার্থীর পোলিং এজেন্ট নিশ্চিত করা, ভোটগ্রহণের দায়িত্ব নিয়োজিত কোনো কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অভিযোগ পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। প্রার্থীসহ সংশ্লিষ্ট সবাইকে আচরণবিধি মানাতে ১ হাজার ৫১ জন ম্যাজিস্ট্রেট নিয়োগ করা হয়েছে, তারা ইতোমধ্যেই কাজ শুরু করেছেন এবং ১৪ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত মাঠে থাকবেন। আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় সেনাবাহিনী, বিজিবি, র্যাব, পুলিশ ও আনসার মিলিয়ে প্রায় ৯ লাখ সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। নির্বাচন পর্যবেক্ষণে থাকছেন ৮১টি দেশি সংস্থার ৫৫ হাজার ৪৫৪ জন এবং ৫৪০ জন বিদেশি পর্যবেক্ষক।
ভোট গ্রহণের জন্য সারাদেশে ২৯৯টি সংসদীয় আসনে ব্যালট পেপার পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে আজকের মধ্যেই। তবে শেরপুর-৩ আসনে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থীর মৃত্যুতে ওই আসনের নির্বাচন স্থগিত করেছে নির্বাচন কমিশন। এ ছাড়া প্রতিটি ভোটকেন্দ্রে নিরাপত্তার দায়িত্বে নিয়োজিত বিভিন্ন বাহিনীর সদস্যরাও আজই কেন্দ্রে কেন্দ্রে পৌঁছে যাচ্ছে।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ভোটার ১২ কোটি ৭৭ লাখ ১১ হাজার ৮৯৯ জন। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার ৬ কোটি ৪৮ লাখ ২৫ হাজার ১৫৪ জন এবং নারী ভোটার ৬ কোটি ২৮ লাখ ৮৫ হাজার ৫২৫ জন। এ ছাড়া তৃতীয় লিঙ্গের ভোটার রয়েছেন ১ হাজার ২২০ জন। নির্বিঘেœ ভোটগ্রহণের লক্ষ্যে ৪২ হাজার ৭৭৯টি কেন্দ্রে ২ লাখ ৪৭ হাজার ৪৮২টি ভোটকক্ষ প্রস্তুত করা হয়েছে। নির্বাচন পরিচালনায় প্রায় ১০ লাখ কর্মকর্তা দায়িত্ব পালন করবেন। ১২ ফেব্রুয়ারি সকাল সাড়ে ৭টা থেকে শুরু হয়ে বিকেল সাড়ে ৪টা পর্যন্ত বিরতিহীনভাবে ভোটগ্রহণ চলবে। একই সঙ্গে সংবিধান ও রাষ্ট্র সংস্কারের লক্ষ্যে ‘গণভোট’ অনুষ্ঠিত হবে।
নির্বাচন কমিশনের সিনিয়র সচিব আখতার আহমেদ জানান, এবারের নির্বাচনের পরিবেশ অতীতের যে কোনো সময়ের চেয়ে ভালো। তফসিল ঘোষণার পর থেকে এখন পর্যন্ত নির্বাচনী সহিংসতাত বা অনিয়মের অভিযোগ আগের তুলনায় অনেক কম। সারাদেশে মাঠ পর্যায়ে প্রশাসন এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সক্রিয় থাকায় সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। নির্বাচন কমিশন কঠোর হস্তে সুষ্ঠু নির্বাচনের পরিবেশ বজায় রাখার সর্বাত্মক চেষ্টা করে যাবে। তবে এ বিষয়ে সবাইকে সহযোগিতা করতে হবে।
অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ ভোট নিশ্চিত করতে মঙ্গলবার বিকেল ৪টা থেকে ৪৮ ঘণ্টার জন্য বহিরাগতদের নিজ এলাকার বাইরে অবস্থান বা যাতায়াতের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে নির্বাচন কমিশন। সারাদেশের জেলা প্রশাসক, পুলিশ সুপার এবং পুলিশ কমিশনারদের এই সিদ্ধান্তের কথা জানানো হয় ইসির পক্ষ থেকে।
A Publication of MUNA National Communication, Media & Cultural Department. 1033 Glenmore Ave, Brooklyn, NY 11208, United States.