01/11/2026 বিএনপি-জামায়াত কি জাতীয় সরকার গঠন করবে?
মুনা নিউজ ডেস্ক
৯ জানুয়ারী ২০২৬ ১৮:০০
আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিতব্য সংসদ নির্বাচনের পর সরকার গঠন নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। নির্বাচন-পরবর্তী সময়ে জামায়াতে ইসলামী জাতীয় সরকার গঠনের কথা বলছে, আর বিএনপি বলছে জাতীয় ঐকমত্যের সরকার গঠনের প্রস্তাবের কথা। এতে প্রশ্ন উঠেছে- দুই দলের প্রস্তাবের মধ্যে কোনো যোগসূত্র আছে কি না, নাকি মৌলিক পার্থক্যই বেশি।
সম্প্রতি বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান ও জামায়াতের আমির শফিকুর রহমানের এক বৈঠকের পর বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় আসে। যদিও ওই বৈঠকে জামায়াতের পক্ষ থেকে কোনো নির্দিষ্ট সরকার কাঠামোর কথা বলা হয়নি। তবে শফিকুর রহমানের বক্তব্যে ইঙ্গিত পাওয়া যায়- নির্বাচনের পর সরকার গঠনের আগে তারা বিএনপির সঙ্গে আলোচনায় বসতে চান এবং দেশের স্থিতিশীলতার স্বার্থে সম্মিলিত সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে আগ্রহী।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা এই বক্তব্যকে ‘ইঙ্গিতপূর্ণ’ হিসেবে দেখছেন। তাদের মতে, জামায়াত নির্বাচন-পরবর্তী সরকার গঠনের বিষয়টি আলোচনার কেন্দ্রে রাখতে চাইছে। ফলে রাজনৈতিক অঙ্গনে প্রশ্ন উঠছে- শেষ পর্যন্ত বিএনপি ও জামায়াত কি কোনো জাতীয় সরকার গঠনে একমত হবে, নাকি আবারও একপক্ষীয় সংসদ গঠিত হবে, অথবা সংসদে কার্যকর বিরোধী দল থাকবে।
তারেক রহমান ও শফিকুর রহমানের বৈঠকটি হয় ভিন্ন প্রেক্ষাপটে। বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার মৃত্যুর একদিন পর, পহেলা জানুয়ারি, জামায়াতের আমির বিএনপির গুলশান কার্যালয়ে শোকবইয়ে স্বাক্ষর করতে গেলে সেখানে এই বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়।
ভিন্ন পরিস্থিতিতে বৈঠক হলেও সেখানে জামায়াতের আমির রাজনীতি ও নির্বাচন-পরবর্তী সরকার গঠন নিয়ে দলের অবস্থান তুলে ধরেন। বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের তিনি বলেন, পাঁচ বছরের জন্য দেশের স্থিতিশীলতা ও সুন্দর পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে সবাই মিলে ভালো কোনো পথ বের করা যায় কি না, তা ভেবে দেখার সময় এসেছে। তিনি জানান, নির্বাচনের পর সরকার গঠনের আগে তারা আলোচনায় বসবেন এবং জাতির স্বার্থে সিদ্ধান্ত নেওয়ার চেষ্টা করবেন।
যদিও তার বক্তব্যে সরকার কাঠামো নিয়ে কোনো সুস্পষ্ট প্রস্তাব ছিল না, তবু সরকার গঠনের আগে বিএনপির সঙ্গে আলোচনার আগ্রহই নানা আলোচনা তৈরি করেছে। এমনকি শফিকুর রহমান নিজেও স্বীকার করেছেন, তার বক্তব্যে একটি ইঙ্গিত রয়েছে, যদিও তা বিস্তারিতভাবে ব্যাখ্যা করেননি।
তিনি বলেন, আওয়ামী লীগের দীর্ঘ সাড়ে পনেরো বছরের শাসনে অর্থনীতি, আইনশৃঙ্খলাসহ বিভিন্ন খাতে ভাঙন দেখা দিয়েছে, যা এখনো পুরোপুরি সামাল দেওয়া যায়নি। এই বাস্তবতায় ঐকমত্য ও সহযোগিতা ছাড়া কোনো দলের এককভাবে দেশ পরিচালনা কঠিন বলেই জামায়াত মনে করে।
তবে বাস্তবে বিএনপি ও জামায়াতের সম্পর্ক বর্তমানে টানাপোড়েনপূর্ণ। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের মাধ্যমে আওয়ামী লীগের শাসনের পতনের পর বিএনপির সাবেক মিত্র জামায়াতই তাদের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। দুই দলের নেতাদের মধ্যে পাল্টাপাল্টি বক্তব্য ও অভিযোগও দেখা যাচ্ছে।
জাতীয় নির্বাচন সামনে রেখে বিএনপি ও জামায়াত দুই ভিন্ন রাজনৈতিক শিবিরের নেতৃত্ব দিচ্ছে। যদিও বিশ্লেষকদের কেউ কেউ মনে করেন, আওয়ামী লীগ ও তাদের মিত্ররা রাজনৈতিকভাবে নিষ্ক্রিয় থাকায় নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক পরিবেশ তৈরিই এখন সক্রিয় দলগুলোর লক্ষ্য।
তবে আওয়ামী লীগবিরোধী আন্দোলনের সময়ই বিএনপি-জামায়াত সম্পর্কের ফাটল স্পষ্ট হয়ে ওঠে। বিএনপির যুগপৎ আন্দোলনে জামায়াতকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি এবং জামায়াত আলাদাভাবে কর্মসূচি পালন করে। বিশ্লেষকদের মতে, রাজনৈতিক স্বার্থ থেকেই এই দূরত্ব তৈরি হয়েছে, যা এখন আরও বেড়েছে।
এই প্রেক্ষাপটে প্রশ্ন উঠছে- নির্বাচনে যে দলই ক্ষমতায় আসুক, তারা কি অপর দলকে সরকারে অংশীদার করবে? বিশ্লেষকদের মতে, রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর সক্রিয় সব দলই মনে করছে অন্তর্বর্তী সরকারের ওপর তাদের প্রভাব রয়েছে, ফলে ক্ষমতার অংশীদার হওয়ার আকাঙ্ক্ষাও বেড়েছে।
লেখক ও বিশ্লেষক মহিউদ্দিন আহমদের মতে, জামায়াত ক্ষমতার কাছাকাছি থাকতে চায় বলেই সরকার গঠনের আগে বিএনপির সঙ্গে আলোচনার কথা বলছে। যদিও জামায়াত নেতারা এই ব্যাখ্যা মানতে নারাজ এবং সব দলের সহযোগিতার প্রয়োজনীয়তার কথাই জোর দিচ্ছেন।
জামায়াত জাতীয় সরকার গঠনের ক্ষেত্রে তিনটি শর্তের কথা বলছে- দুর্নীতির কোনো সুযোগ না দেওয়া, বিচার বিভাগে সরকারের হস্তক্ষেপ বন্ধ রাখা এবং জুলাই আন্দোলনের চেতনায় সব দলের সম্মত সংস্কার প্রস্তাব বাস্তবায়ন। জামায়াতের বক্তব্য অনুযায়ী, নির্বাচনে জয়ী হলে এই শর্তে যারা একমত হবে, তাদের নিয়েই তারা জাতীয় সরকার গঠন করতে চায়।
জামায়াতের আমির জানিয়েছেন, তারা কোনো সরকারে গিয়ে দুর্নীতির দায় নিতে প্রস্তুত নন। বিশ্লেষকদের মতে, এই বক্তব্যে বিএনপির প্রতিও ইঙ্গিত থাকতে পারে। তবে সরকার গঠনের আগে বিএনপির সঙ্গে আলোচনার আগ্রহ জানানোয় প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে- জামায়াত কি বিএনপির সঙ্গে সরকারে যেতে চায়।
এ বিষয়ে শফিকুর রহমান বলেন, বিএনপি জামায়াতকে বাদ দিয়েই জাতীয় ঐকমত্যের সরকার গঠনের কথা বলছে। বর্তমান রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বাস্তবতায় সব দলের সহযোগিতার বিষয়টি সামনে আনতেই জামায়াত এই প্রস্তাব দিচ্ছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
জামায়াত সরকার গঠনের সুযোগ পেলে জাতীয় সরকারের ধারণা বাস্তবায়নে এগোবে। আর বিএনপি সরকার গঠন করলে তারা সহযোগিতা করতে চায় বলে জানিয়েছে। ইসলামী আন্দোলন, জাতীয় নাগরিক পার্টিসহ জামায়াতের সঙ্গে আসন সমঝোতায় থাকা দলগুলোও এই তিন শর্তে জাতীয় সরকার গঠনের পক্ষে।
দুই দলের প্রস্তাবে যোগসূত্র থাকার বিষয়টি উভয় পক্ষই অস্বীকার করছে। তবে পার্থক্য স্পষ্ট- জামায়াত বলছে জাতীয় সরকার, আর বিএনপি বলছে জাতীয় ঐকমত্যের সরকার।
বিএনপি ২০২২ সালে যুগপৎ আন্দোলনের সময় দেওয়া ৩১ দফা সংস্কার প্রস্তাবে জামায়াতকে বাদ রেখেই মিত্রদের নিয়ে জাতীয় ঐকমত্যের সরকার গঠনের কথা উল্লেখ করে। এ বিষয়ে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, তারা জামায়াতকে বাদ রেখেই সরকার গঠনের অবস্থানে রয়েছেন।
বিএনপির আরেক নেতা বলেন, সব দলকে নিয়ে সরকার গঠন করলে সংসদে কার্যকর বিরোধী দল থাকবে না এবং একপক্ষীয় সংসদ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা থাকে। তাই সহযোগিতা আর ক্ষমতার অংশীদারত্ব-এই দুইয়ের মধ্যে পার্থক্য রাখতে চায় বিএনপি।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, প্রকাশ্য অবস্থান বিবেচনায় বিএনপি ও জামায়াতের মধ্যে যৌথভাবে সরকার গঠনের সম্ভাবনা আপাতত কম। কারণ উভয় দলই ভিন্ন শিবিরের নেতৃত্ব দিয়ে নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে এবং একে অপরকে বাদ রেখেই সরকার গঠনের কথা বলছে।
(বিবিসি বাংলা থেকে নেওয়া)
A Publication of MUNA National Communication, Media & Cultural Department. 1033 Glenmore Ave, Brooklyn, NY 11208, United States.